কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম হারুয়ায় কসাইখানা সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সংগ্রহশালা, যা স্থানীয়দের কাছে 'পুরোনো বুকশপ' এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কাছে 'ওল্ড কালেকশন' নামে পরিচিত। ৩৮ বছর বয়সী শরিফুল ইসলাম তাঁর ভাড়া বাসার পাশে একটি মাঝারি দোকানঘরে এই সংগ্রহশালাটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখানে সংরক্ষিত আছে ৫০০ বছরের প্রাচীন হস্তলিখিত তুলট কাগজের পুঁথি এবং ১৮৫১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত শিশুশিক্ষা গ্রন্থ 'বোধোদয়'। এছাড়া ১৩৫৫ সালে প্রকাশিত কাব্য সাহিত্য 'জয়গান', শতাব্দীপ্রাচীন পাঠ্যবই 'আমার সাথী' এবং অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য বাংলা পাঠ্যবই 'মুক্তাহার' এর মতো অমূল্য সম্পদ এখানে পাওয়া যায়।
নওগাঁর রানীনগর উপজেলার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম গত ১২ বছর ধরে কিশোরগঞ্জে বসবাস করছেন। তাঁর এই সংগ্রাহক হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে একটি আবেগঘন গল্প। ২০১৫ সালে তিনি লক্ষ্য করেন, হাওরাঞ্চলের কিছু দোকানি ৪০-৫০ বছর পুরোনো নিউজপ্রিন্টের পত্রিকা ও ম্যাগাজিন বেশি দামে বিক্রি করছেন। পরে জানতে পারেন, সেই ঐতিহাসিক কাগজগুলো কেটে টুকরো করে বিড়ি তৈরি করা হয়। ইতিহাসের সাক্ষী এসব দলিল এভাবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দেখে শরিফুল সংকল্প করেন এগুলো সংগ্রহ করার। তাঁর এই প্রচেষ্টায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার।
শরিফুলের সংগ্রহশালায় শুধু বইপত্রই নয়, বরং সত্তরের দশকের পত্রিকা-ম্যাগাজিন, ব্রিটিশ আমলের রেলওয়ের টিকিট, পুরোনো কম্পিউটার, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট প্লেয়ার, সাদাকালো টেলিভিশন, পাম্প লাইট এবং প্রাচীন ধাতব মুদ্রার মতো নানা প্রাচীন জিনিসপত্র রয়েছে। এছাড়াও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও সাড়াজাগানো হাতে লেখা চিঠি এখানে সংরক্ষিত। সারা দেশ থেকে সংগৃহীত এসব জিনিস প্রথমে একটি বড় গুদামঘরে রাখা হয়, সেখান থেকে বাছাই করে সংগ্রহশালায় স্থান দেওয়া হয়।
ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের সংগ্রাহকদের কাছে তিনি এসব জিনিস পৌঁছে দেন। তাঁর সংগ্রহে থাকা কিছু বিরল জিনিসের আকাশচুম্বী দাম। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত 'দৈনিক বাংলাদেশ' পত্রিকার একটি সংস্করণ তিনি এক প্রবাসী লেখকের কাছে ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। এছাড়া ১৯৭০ সালের গোয়েন্দা উপন্যাস 'দুষ্টগ্রহ' অস্ট্রেলিয়ার এক প্রবাসীর কাছে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। তবে অনেক অমূল্য সম্পদ তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধরে রেখেছেন এবং উচ্চমূল্যের প্রস্তাব পেলেও তা বিক্রি করতে রাজি হন না।
কিশোরগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মোজাহিদুল ইসলামসহ অনেক গবেষক ও লেখক এই সংগ্রহশালাটি পরিদর্শন করেন। তাঁর মতে, এই সংগ্রহশালাটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তবে শরিফুল ইসলাম বর্তমানে আর্থিক সংকটে ভুগছেন এবং সংগ্রহের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাঁচের শেলফসহ আধুনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন। সরকারি বা বিত্তশালীদের সহযোগিতায় এই সংগ্রহশালাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।




