শিশুদের মধ্যে সাধারণত বেশি দেখা গেলেও সম্প্রতি তরুণদের মধ্যেও ঘুমের মধ্যে দাঁত ঘষার প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে 'স্লিপ ব্রুক্সিজম' বলা হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে প্রায়ই টের পান না, কিন্তু পাশে ঘুমানো মানুষের ঘুম ভেঙে যায় এই শব্দে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অনিয়মিত জীবনযাত্রা, ঘুমের সমস্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে শ্বাস-প্রশ্বাসের জটিলতা এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
তরুণদের জীবনে মানসিক চাপের উৎস অনেক — পড়াশোনা, পেশা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এমনকি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও। দিনের বেলায় এই চাপের ফলে চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে থাকে এবং দাঁত চেপে ধরার অভ্যাস তৈরি হয়। ঘুমের সময়ও শরীর সেই চাপ বহন করে, ফলে অজান্তেই দাঁত ঘষা শুরু হয়।
ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করার অন্যতম কারণ রাত জেগে স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘ সময় কাটানো। মুঠোফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেটের নীল আলো ঘুমের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়। অনিয়মিত ঘুম ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব অস্থির ঘুমের সৃষ্টি করে, যা দাঁত ঘষার প্রবণতা বাড়ায়। তাই ঘুমানোর আগে ডিভাইস থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যাও দাঁত ঘষার সঙ্গে সম্পর্কিত। অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্তদের ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালি বারবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। নিয়মিত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে হাঁসফাঁস করা, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা কিংবা সকালে ক্লান্তি বোধ — এই লক্ষণগুলো থাকলে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তবে দাঁত ঘষার একমাত্র কারণ হিসেবে শ্বাসের সমস্যাকেই দায়ী করা উচিত নয়।
রাতের দিকে ক্যাফেইন গ্রহণও সমস্যা বাড়াতে পারে। চা, কফি, এনার্জি ড্রিংক ও কিছু কোমল পানীয়তে থাকা ক্যাফেইন স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় রাখে। সন্ধ্যার পরে বা ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত ক্যাফেইন ঘুমের গভীরতা কমিয়ে দেয়, ফলে রাতে দাঁত ঘষার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।
দীর্ঘদিন ধরে দাঁত ঘষলে দাঁতের উপরিভাগ ক্ষয় হতে পারে, দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়তে পারে, চোয়ালে ব্যথা বা জড়তা অনুভূত হতে পারে এবং সকালে মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত চাপে দাঁতে ফাটল ধরারও ঝুঁকি থাকে। শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে দাঁত ওঠার সময় সাময়িকভাবে এমনটা দেখা গেলেও তা নিয়মিত হলে বা ক্ষতির লক্ষণ থাকলে দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দাঁত ঘষার কোনো একক কারণ নেই, তাই শুধু শব্দ বন্ধ করার চেষ্টা নয় — অন্তর্নিহিত কারণ খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা, রাতে ক্যাফেইন বাদ দেওয়া এবং স্ক্রিন টাইম সীমিত করা সহায়ক হতে পারে। দাঁত ক্ষয়, চোয়ালে ব্যথা বা মাথাব্যথা থাকলে দন্তচিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। নাক ডাকা বা শ্বাস নিতে সমস্যা হলে ঘুম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি। এই প্রবণতা নিছক অভ্যাস নয় — এটি শরীরের অন্য কোনো সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে, তাই উপেক্ষা না করে সচেতন হওয়াই ভালো।




