শহুরে জীবনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছুটির দিনে প্রকৃতির কোলে কিছুটা সময় কাটানো যেন এক অলিখিত রেওয়াজ। সম্প্রতি এমনই এক বিকেলে দুই বন্ধু মিলে বেরিয়ে পড়েছিলেন ময়মনসিংহের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কের উদ্দেশ্যে। কাচারিঘাট এলাকায় পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই উদ্যানটি শহরের বাসিন্দাদের কাছে বহুদিন ধরেই একটি প্রিয় ভ্রমণস্থল। কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে, আর তার সঙ্গে মিশে আছে নদের অবারিত জলরাশি ও সবুজের সমারোহ।
ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই পার্কের ভেতরটা ছিল মানুষের ঢল। শিশুদের খেলার সরঞ্জাম, সারি সারি বেঞ্চ, আর গাছের ছায়ায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন নানা বয়সের মানুষ। চারপাশে যেন এক মেলার আমেজ—কোথাও নাগরদোলা ঘুরছে, কোথাও বেলুন বিক্রেতার ডাক, আর ছোটদের খেলনার দোকানগুলোতে ভিড় লেগেই আছে। সবুজ চত্বর পেরিয়ে যখন ঘাটের দিকে এগোলাম, তখন চোখে পড়ল রঙিন পাল তোলা ডিঙি নৌকার সারি। নদের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে পর্যটকরা, তাদের হাসি-আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ। আমরাও একটি নৌকা ভাড়া করে রওনা দিলাম ওপারে। নদের মাঝখানে এসে মনে হলো, নীল আকাশ আর শান্ত জলরাশি যেন এক বিন্দুতে মিশে গেছে; দূর থেকে ভেসে আসা শহরের কোলাহল ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসে, আর হালকা বাতাসের ছোঁয়ায় মনটা হালকা হয়ে যায়।
নৌকা ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় খাবারের স্বাদও নেওয়া হলো। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের সঙ্গে পোড়া রুটির মজাই ছিল আলাদা। আর আড্ডার সঙ্গী হিসেবে জুটে গেল ফুচকা আর ঝালমুড়ি—এ যেন এক বাঙালি নিখুঁত আয়োজন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই পার্কজুড়ে আলোকসজ্জা জ্বলে ওঠে, নদের পাড় তখন অন্য রূপ ধারণ করে। দিনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি অপেক্ষা করছিল সূর্যাস্তের জন্য। ধীরে ধীরে সূর্য যখন ব্রহ্মপুত্রের বুকে ডুবে যাচ্ছিল, তখন তীরে বসে সেই দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল যেন প্রকৃতি তার সমস্ত সৌন্দর্য নিংড়ে দিচ্ছে। গোধূলির সোনালি আলোয় নদের জল রক্তিম আভায় রঞ্জিত হয়ে এক মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করে।
পার্কের পাশেই রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা, যেখানে সংরক্ষিত আছে এই প্রখ্যাত শিল্পীর অনবদ্য সব চিত্রকর্ম। আগ্রহীরা চাইলে সেই সংগ্রহশালা ঘুরে দেখতে পারেন, কিংবা কাছাকাছি অবস্থিত শশীলজ ও আলেকজান্ডার ক্যাসেলের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাও এক নজরে দেখে নিতে পারেন। এক দিনেই প্রকৃতি, ইতিহাস আর সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে এক অনন্য অভিজ্ঞতা অর্জন সম্ভব। শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে, নদীর সান্নিধ্যে এমন একটি বিকেল সত্যিই মনে গেঁথে থাকবে বহুদিন।




