প্রায় ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার বুকে এক অভূতপূর্ব সামাজিক উদ্যোগের সূচনা হয়। রক্তক্ষয়ী হারবুল ফিজারের অবসানের পর নগরীর জনজীবনে আইনের শাসন ছিল বলতে গেলে অনুপস্থিত। গোত্রপ্রধানদের অনানুষ্ঠানিক পরিষদ ‘আল-মালা’ই ছিল সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব, কিন্তু সেখানেও গোত্রীয় পক্ষপাতিত্বই মুখ্য হয়ে উঠত। ফলে কোনো দুর্বল বা বহিরাগত ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই মক্কার কয়েকটি গোত্র মিলে গড়ে তোলে হিলফুল ফুজুল—একটি ন্যায় ও সদাচারের অঙ্গীকার, যাতে বিশ বছর বয়সী তরুণ মুহাম্মদ (সা.)-ও অংশ নেন।

ঘটনার সূত্রপাত এক ইয়েমেনি বণিকের সঙ্গে। জুবাইদ গোত্রের ওই বণিক মক্কায় পণ্য বিক্রি করেন কোরাইশের বনু সাহম গোত্রের নেতা আস ইবনে ওয়ায়েলের কাছে। কিন্তু মূল্য পরিশোধের সময় আস ইবনে ওয়ায়েল তা অস্বীকার করে বসেন। ভুক্তভোগী বণিক মক্কার প্রভাবশালী গোত্রগুলোর কাছে সুবিচার চেয়েও ব্যর্থ হন—কারণ আসের গোত্রীয় প্রতিপত্তির কাছে সবাই নতি স্বীকার করেছিল। একপর্যায়ে তিনি কাবার পাশের আবু কোবাইস পাহাড়ে উঠে উচ্চৈঃস্বরে কবিতার মাধ্যমে নিজের দুঃখের কথা জানান। তাঁর সেই আর্তনাদ কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত কোরাইশ নেতাদের মধ্যে গভীর সাড়া জাগায়।

প্রথম প্রতিক্রিয়া আসে বনু হাশিমের প্রধান জোবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিবের কাছ থেকে। তিনি ঘোষণা করেন, এই অবিচার আর সহ্য করা যাবে না। তাঁর আহ্বানে মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন আত-তায়মির বাসভবনে এক জরুরি সম্মেলন ডাকা হয়। এই সম্মেলনে যোগ দেয় পাঁচটি গোত্র—বনু হাশিম, বনু আল-মুত্তালিব, বনু আসাদ ইবনে আবদুল উজ্জা, বনু জুহরাহ এবং বনু তাইম। বনু হাশিমের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন জোবাইর, আবু তালিব, হামজা এবং তরুণ মুহাম্মদ (সা.)। বনু তাইমের প্রতিনিধি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে জুদআন নিজে, বনু জুহরাহ থেকে মাখরামা ইবনে নাওফাল, আর বনু আসাদের পক্ষে খুওয়াইলিদ ইবনে আসাদ ও নওফল ইবনে খুওয়াইলিদ। বিপরীতে তৎকালীন সবচেয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বনু উমাইয়া, বনু মাখজুম ও বনু সাহম এই সম্মেলন বর্জন করে। ফলে চুক্তিটি কার্যত দুর্বলদের পক্ষে ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে একটি বিকল্প জোটে পরিণত হয়।

সম্মেলনে শপথের আচার ছিল ধর্মীয়-সামাজিক রীতিতে আবৃত। জমজমের পানিতে সুগন্ধি মিশিয়ে নেতারা তাতে হাত ডুবিয়ে অঙ্গীকার করেন এবং পরে কাবা প্রাঙ্গণে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে শপথ সম্পন্ন করেন। সনদের মূল বক্তব্য ছিল—মক্কার হারাম সীমানার ভেতরে স্থানীয় বা বহিরাগত যেকোনো ব্যক্তির ওপর অবিচার হলে সবাই একজোট হয়ে অত্যাচারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, যতক্ষণ না মজলুমের অধিকার সম্পূর্ণ ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শপথের পরপরই নেতারা সরাসরি আস ইবনে ওয়ায়েলের বাড়িতে যান এবং যৌথ চাপের মুখে তিনি বণিকের পাওনা সম্পূর্ণ মিটিয়ে দিতে বাধ্য হন।

‘ফুজুল’ নামকরণের পেছনে দুটি ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি মতে, অতীতে জুরহুম গোত্রের তিনজন ‘ফাজল’ নামধারী ব্যক্তি অনুরূপ ন্যায়বিচার চুক্তি করেছিলেন, তাই সেই স্মরণে নতুন চুক্তিটির নাম রাখা হয়। অন্যমতে, আরবি ‘ফাজল’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত সদাচার—গোত্রীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। ঘটনাটি ঘটে হারবুল ফিজারের কিছুকাল পর, আনুমানিক ৩৩ হিজরি পূর্ব সনে, যখন নবীজির বয়স ছিল পূর্ণ বিশ চান্দ্রবছর।

নবুয়তপ্রাপ্তির বহু বছর পরও মহানবী (সা.) এই চুক্তির কথা গর্বের সঙ্গে স্মরণ করতেন। তিনি বলেছেন, “আমি আবদুল্লাহ ইবনে জুদআনের ঘরে এমন একটি ন্যায়বিচারের চুক্তির সাক্ষী ছিলাম, যা আরবের মূল্যবান লাল উটের বিনিময়েও আমি ভাঙতে রাজি হতাম না। আর ইসলাম আসার পরও যদি এমন কোনো চুক্তির ডাক আসে, তবে আমি নিশ্চয় তাতে সাড়া দেব।” আরেকটি বিখ্যাত হাদিসে তিনি বলেছেন, জাহেলি যুগে ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত যেসব চুক্তি হয়েছিল, ইসলাম তা দুর্বল করেনি, বরং আরও সুদৃঢ় করেছে। এই হাদিস দুটি থেকে ফিকহবিদেরা নীতি গ্রহণ করেছেন যে গোত্র, ধর্ম বা সীমানার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের ন্যায্য অধিকার ও মজলুমের সুরক্ষার জন্য যেকোনো সর্বজনীন উদ্যোগ ইসলামি শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।

উমাইয়া শাসনামলেও এই চুক্তির নৈতিক প্রভাব অটুট ছিল। মদিনার প্রশাসক ওয়ালিদ ইবনে উতবা যখন নবীজির দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলীর ‘জু-খুশুব’ উপত্যকার বাগান জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা করেন, তখন হোসাইন (রা.) হুঁশিয়ারি দেন—হয় সম্পত্তি ফিরিয়ে দিন, নতুবা তিনি মদিনার মসজিদে দাঁড়িয়ে হিলফুল ফুজুলের আহ্বান জানাবেন। এই ঘোষণায় আবদুল্লাহ ইবনে জোবাইর ও আবদুর রহমান ইবনে আউফের মতো প্রবীণ সাহাবিরা প্রকাশ্যে তার পক্ষ নেন। সম্মিলিত চাপে প্রশাসক নতি স্বীকার করে সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। প্রায় ষাট বছর পরও এই চুক্তির ঐতিহাসিক ওজন যে কতটা গভীর ছিল, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।