টাঙ্গাইলের সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজের প্রাঙ্গণে সোমবার এক বিরল ও আবেগঘন দৃশ্যের সাক্ষী হলো উপস্থিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা। দীর্ঘ তিন দশক ধরে শিক্ষাদানের পর অবসরে যাচ্ছেন ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক এ কে ফজলুল হক মিয়া। তাঁর শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিদায় সংবর্ধনা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, হয়ে ওঠে স্মরণীয় এক অধ্যায় যা উপস্থিত সবার হৃদয়ে দাগ কাটে।
১৯৯২ সালে উপজেলার হাতিয়া ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবনের সূচনা করেন তিনি। ১৯৯৬ সালে সখীপুর আবাসিক মহিলা কলেজে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত। আজ ছিল সেই দীর্ঘ পথচলার শেষ দিন।
বেলা ১১টায় কলেজে শুরু হয় জমকালো বিদায় অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন কলেজের অধ্যক্ষ এম এ রউফ। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশরাফুল আলম। বিশেষ অতিথির আসনে ছিলেন উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজিম উদ্দিন। বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হাসান, কলেজের উপাধ্যক্ষ এস এম জাকির হুসাইন, বাংলা বিভাগের প্রধান মুহম্মদ আবদুল আলীম, ফারুক হোসেন, মাহমুদুল হক শামীম, খাইরুন নাহার মল্লিক, হামিদুর রহমান এবং ইংরেজি বিভাগের অনার্সের শিক্ষার্থী সুমি আক্তারসহ আরও অনেকে।
অনুষ্ঠানে কলেজের পক্ষ থেকে বিদায়ী শিক্ষককে উপহার ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। ইংরেজি বিভাগের পক্ষ থেকেও তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও উপহার দেওয়া হয়। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফজলুল হক মিয়া। তিনি বলেন, বিদায় বেলায় এত সম্মান পাবেন—এটি তাঁর কল্পনার বাইরে ছিল। ভালো লাগার অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি আরও জানান, জীবনে এমন রাজকীয় বিদায়ের স্মৃতি কখনো ভুলবেন না। তাঁর ভাষায়, ‘বিদায় বেলায় আমাকে এত সম্মান দেখানো হবে, তা আমি কখনো ভাবতেও পারিনি। আমার খুবই ভালো লেগেছে। এমন রাজকীয় বিদায়ের কথা আমি জীবনে কখনো ভুলতে পারব না।’
অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এরপর শুরু হয় ভিন্ন এক আয়োজন। একটি সজ্জিত প্রাইভেট কারে বসানো হয় তাঁকে। গাড়িটির সামনে ছিল প্রায় ৪০টি মোটরসাইকেলের বিশাল বহর। প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয় সখীপুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর বাসায়। এ যাত্রায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী সালেহা বেগম ও দুই কন্যা। উপস্থিত শিক্ষার্থীদের চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার ছাপ, আর দীর্ঘদিনের শিক্ষকের এই বিদায় মুহূর্তে কলেজের পরিবেশ হয়ে ওঠে আরও আবেগময়।
কলেজের অধ্যক্ষ এম এ রউফ বলেন, ‘ফজলুল হক স্যার শুধু একজন ভালো শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ভালো মানুষও। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।’ দীর্ঘ ৩০ বছরের শিক্ষকতার অবসান ঘটলেও, শিক্ষার্থীদের মনে তাঁর ছাপ রয়ে যাবে বলে মনে করছেন সহকর্মীরা। এমন রাজকীয় বিদায় পাওয়ার কথা হয়তো অনেক শিক্ষকেরই স্বপ্ন, কিন্তু ফজলুল হক মিয়ার জন্য তা বাস্তবে রূপ নিল তাঁর শেষ কর্মদিবসে।




