ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের নামে ভুল ছবি প্রদর্শনের ঘটনা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি সংস্কার শেষে উদ্বোধন হওয়া এই সংগ্রহশালায় 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকের একাংশ' শিরোনামে ছয়জন সাহিত্যিকের নামের পাশে যে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত চেহারার সঙ্গে মেলে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে এবং বৃহস্পতিবার ছবিগুলো সরিয়ে সেখানে নতুন একটি ফ্রেম টাঙানো হয়েছে।

যে ছয়জন সাহিত্যিকের ছবি নিয়ে এই বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তারা হলেন— পল্লিকবি জসীমউদ্‌দীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষক শহীদ মুনীর চৌধুরী, বাংলা একাডেমির সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক, কবি আসাদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আবুল ফজল এবং ভাষাবিদ মুহম্মদ এনামুল হক। সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত ছবিগুলোর মধ্যে জসীমউদ্‌দীন, মুনীর চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক ও আসাদ চৌধুরীর নামের সাথে যে ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো তাদের নয় বলে জানা গেছে। আবুল ফজলের নামের সঙ্গেও ভিন্ন ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। শুধুমাত্র মুহম্মদ এনামুল হকের ছবিটির সাথে তার প্রকৃত চেহারার কিছুটা মিল পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিক মনজুর এই ছবি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'এগুলো মোটেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ছবি নয়। জসীমউদ্‌দীন, মুনীর চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, আসাদ চৌধুরী— কারো নামের সাথে ব্যবহৃত ছবিই তাদের নয়। আবুল ফজলের ছবিটিও তার হওয়ার কথা নয়; শ্মশ্রুমণ্ডিত ভিন্ন আবুল ফজলই আমাদের কাছে পরিচিত।' তিনি আরও বলেন, 'একমাত্র মুহম্মদ এনামুল হকের ছবিটিই তার চেহারার সাথে কিছুটা মিল রয়েছে। তবে প্রতিটি ছবিই এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি বলে মনে হচ্ছে।' ছয় সাহিত্যিকের তালিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই অধ্যাপক। তাঁর মতে, 'খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের একাংশ' শিরোনামে যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তা অত্যন্ত খণ্ডিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতিমানদের সংখ্যা এত বেশি যে সবাইকে এক দেওয়ালে জায়গা দেওয়া সম্ভব নয়, তাই নির্দিষ্ট কয়েকজনকে বেছে নেওয়াটা সমীচীন হয়নি।

ডাকসু কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, ছবিগুলো ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে ডিজাইনের সময় ছবির মান বাড়াতে গিয়ে কিছু ছবির চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায় বলে তারা স্বীকার করেছে। ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, 'ডিজাইনারকে যখন ছবিগুলো দেওয়া হয়, সে কোয়ালিটি বাড়াতে গিয়ে দুই-তিনটা ছবি একই রকম হয়ে যায়। এআই ব্যবহার করলে এমনটা হতে পারে।' তবে এআই ব্যবহার করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'এআই দিয়ে বানানো হয়নি। সবার ছবি ইন্টারনেট থেকে নেওয়া হয়েছে। ছবিগুলোর কোয়ালিটি এনহ্যান্স করতে গিয়েই এই সমস্যা হয়েছে।' তিনি আরও বলেন, 'অনেক ছবি একসাথে ছিল, খেয়াল করিনি। পরে সেদিন দেখার পরই বিষয়টি নিয়ে ডিজাইনারকে জানাই। সে নতুন ছবি পাঠিয়েছে। আজকে প্রিন্ট করে পাঠিয়ে ছবি লাগানো হয়েছে।'

প্রসঙ্গত, সংস্কার শেষে গত রোববার ডাকসু সংগ্রহশালা উদ্বোধন করা হয়। সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি না থাকলেও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছবি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জিন্নাহর 'কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা' ঘোষণার ছিল। এর প্রতিবাদে সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর ছবি তিনটি ছিঁড়ে ফেলেন আবু তৈয়ব হাবিলদার নামের এক শিক্ষার্থী। পরে সেই স্থানে যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি সাঁটিয়ে প্রতিবাদ জানায় ছাত্র ফেডারেশন। এই ঘটনার পরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।