ইসলামি ইতিহাসের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বর্ণালী অধ্যায় হিসেবে পরিচিত তাবেয়িদের যুগ। যারা ঈমানের সাথে অন্তত একজন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং ঈমানের সাথে জীবনাবসান ঘটিয়েছেন, তাঁদেরই 'তাবেয়ি' বলা হয়। যদিও তাঁরা সরাসরি নবীজির (সা.) সান্নিধ্য পাননি, তবে সাহাবিদের জীবনদর্শন ও আদর্শকে তাঁরা এতটাই নিবিড়ভাবে আত্মস্থ করেছিলেন যে, তাঁদের জীবন হয়ে উঠেছিল তাকওয়া এবং দুনিয়াবিমুখতার এক অনন্য মাপকাঠি। নবীজির (সা.) একটি হাদিসে এই প্রজন্মের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে, যেখানে সাহাবিদের পর তাবেয়িদের যুগের মানুষকে সর্বোত্তম হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
তাবেয়িদের জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল অবিরাম জ্ঞান অর্জন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস ও সুন্নত সংগ্রহের জন্য তাঁরা অসীম ধৈর্য ও পরিশ্রম প্রদর্শন করতেন। একটি মাত্র হাদিসের সন্ধানে তাঁরা মাসের পর মাস মরুভূমির রুক্ষ পথ পাড়ি দিয়ে সফর করতেন। মক্কা, মদিনা, কুফা, সিরিয়া ও বসরার মতো শহরগুলোতে সাহাবিদের ঘিরে জ্ঞানের বিশাল মজলিশ গড়ে উঠত। মদিনার প্রখ্যাত তাবেয়ি সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.)-এর মতো ব্যক্তিত্বরা দিন-রাত পরিশ্রম করে হাদিস সংগ্রহ করতেন, যার ফলে আজ মুসলিম উম্মাহ বিশুদ্ধ জ্ঞানভাণ্ডারের উত্তরাধিকারী হতে পেরেছে।
জাগতিক সম্পদের মোহ থেকে তাঁরা ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। সেই সময়ে ইসলামি সাম্রাজ্য রোম থেকে পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও এবং চারদিকে ধনসম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও তাবেয়িদের জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ। তাঁদের পোশাক-আশাক ও খাবার ছিল সাদাসিধে। হাসান বসরি (রহ.) বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবিদের দুনিয়াবিমুখতার কথা উল্লেখ করে বর্তমান প্রজন্মের দুনিয়াপ্রীতির প্রতি সতর্ক করেছিলেন। সম্পদ থাকলেও তা তাঁরা নিঃসংকোচে দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তিতে জীবন অতিবাহিত করতেন।
ইবাদতে তাঁদের একাগ্রতা ছিল বিস্ময়কর। দিনের বেলা কর্মব্যস্ত থাকলেও রাতগুলো কাটত আল্লাহর স্মরণে ও প্রার্থনায়। উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.)-এর মতো তাবেয়ির উদাহরণ ইতিহাসে অমর হয়ে আছে, যিনি অসুস্থ অবস্থায় পা কাটার সময় অজ্ঞান করার ওষুধ নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন নামাজের সময় আল্লাহর প্রতি এতটাই মগ্ন থাকতে যে, পা কাটার যন্ত্রণা যেন তাঁর অনুভূতিতে না আসে।
হালাল উপার্জনের ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন কঠোর। ইবাদত ও ইলম চর্চার পাশাপাশি তাঁরা নিজস্ব উপার্জনে স্বাবলম্বী ছিলেন এবং হালাল রিজিক অন্বেষণকে ইবাদতের অংশ মনে করতেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.)-এর সততার উদাহরণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। তেলের একটি পাত্রে মৃত ইঁদুর পাওয়ার সন্দেহে তিনি ৪০ হাজার দিরহাম মূল্যের পুরো তেল মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন, যাতে কোনো মুসলিম সন্দেহযুক্ত পণ্য না পান। এই সততার কারণে তাঁকে আর্থিক ক্ষতি এবং এমনকি কারাবরণ করতে হলেও তিনি নীতি বিসর্জন দেননি।
তাবেয়িদের চরিত্রের আরেকটি বিশেষ দিক ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিনয়। মতাদর্শিক ভিন্নতা বা ফিকহি মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবদুর রহমান আওজায়ি (রহ.)-এর মধ্যে নামাজের কিছু মাসআলা নিয়ে তীব্র বিতর্ক থাকলেও, তাঁদের অন্তরে ছিল একে অপরের জন্য ভালোবাসা। ইমাম আওজায়ি (রহ.) ইমাম আবু হানিফার প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, জ্ঞানের একটি বিশাল স্তম্ভ ধ্বংস হয়ে গেল। সামগ্রিকভাবে, তাবেয়িদের জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও কীভাবে হৃদয়কে কেবল স্রষ্টার সাথে যুক্ত রাখা সম্ভব।




