আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১ হাজার বছর আগে আফ্রিকায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন লোকমান হাকিম। পবিত্র কোরআনের ৩১ নম্বর সুরাটি তাঁর নামেই নামকরণ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা লোকমান হাকিমকে বিশেষ প্রজ্ঞা দান করেছিলেন, যার প্রতিফলন পাওয়া যায় তাঁর সন্তানের প্রতি দেওয়া দিক-নির্দেশনাগুলোতে। সুরা লোকমানের ১৩ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই উপদেশগুলো মূলত বিশ্বাস, ইবাদত, সামাজিক শিষ্টাচার এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের এক পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা।

লোকমান হাকিমের প্রথম ও প্রধান উপদেশ ছিল বিশ্বাসের ভিত্তি মজবুত করা। তিনি তাঁর সন্তানকে আল্লাহর সাথে শিরক না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন যে, শিরক হলো সবচেয়ে বড় অন্যায়। তাঁর মতে, মানুষের জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস, আর এই বুনিয়াদ সঠিক না হলে জীবনের অন্য কোনো অর্জন প্রকৃত সাফল্য এনে দিতে পারে না। এরপর দ্বিতীয় উপদেশে মা-বাবার প্রতি শ্রদ্ধার কথা উঠে এসেছে। এখানে কোরআনের নির্দেশনায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, একজন মা সন্তানকে অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে গর্ভে ধারণ করেন। তাই নিজের অবস্থান বা যোগ্যতা নিয়ে গর্ব করার আগে মা-বাবার ত্যাগ ও শ্রমের কথা ভুলে যাওয়া মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

তৃতীয় উপদেশে লোকমান তাঁর সন্তানকে আল্লাহর সর্বব্যাপী জ্ঞানের কথা জানান। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কোনো কাজ যদি শর্ষের দানার মতো ক্ষুদ্র হয় এবং তা পাহাড়ের ভেতরে কিংবা পৃথিবীর কোনো গোপন প্রান্তে থাকে, আল্লাহ তা অবশ্যই জানবেন এবং প্রকাশ করবেন। কারণ আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী এবং সব বিষয়ে সম্যক অবহিত। চতুর্থ উপদেশে তিনি নামাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এখানে কেবল নামাজ পড়ার কথা বলা হয়নি, বরং একে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে 'প্রতিষ্ঠা' করার কথা বলা হয়েছে, যাতে নামাজের প্রভাব মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে দূরে রাখতে পারে।

সামাজিক দায়িত্ববোধের কথা বলে পঞ্চম উপদেশে তিনি সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধ করার তাগিদ দিয়েছেন। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের প্রতি মানুষকে দায়বদ্ধ করে। ষষ্ঠ উপদেশে লোকমান হাকিম ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়েছেন যে, সত্যের পথে থাকলে অনেক সময় প্রতিকূলতা বা ব্যক্তিগত অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়, তবে সেই সময়ে বিচলিত না হয়ে দৃঢ় সংকল্পের সাথে ধৈর্য ধরা প্রয়োজন।

সপ্তম উপদেশে তিনি অহংকারের কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। দম্ভভরে চলাফেরা করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া আল্লাহর কাছে অপছন্দনীয়। রাসুল (সা.)-এর হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে এখানে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে হেয় মনে করাই হলো প্রকৃত অহংকার। অষ্টম উপদেশে তিনি জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বনের কথা বলেছেন। পোশাক-পরিচ্ছদ, ব্যয় এবং সামাজিক আচরণে ভারসাম্য রাখা একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সবশেষে নবম উপদেশে তিনি কণ্ঠস্বর সংযত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, সবচেয়ে অপ্রীতিকর শব্দ হলো গাধার ডাক। এর অর্থ এই নয় যে সব সময় নিচু স্বরে কথা বলতে হবে, বরং অযথা উচ্চকণ্ঠ এবং অসংযত আচরণ পরিহার করার কথা বলা হয়েছে। লোকমান হাকিমের এই নয়টি উপদেশ প্রমাণ করে যে, জীবনের প্রকৃত পরিবর্তন শুরু হয় বিশ্বাসের সংশোধন থেকে, যা পরবর্তীতে ইবাদত, দায়িত্ববোধ এবং সুন্দর আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।