পবিত্র কোরআন মূলত কোনো বিজ্ঞানগ্রন্থ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়, বরং এটি মানবজাতির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান ও হেদায়েত। তবে এই গ্রন্থে মহাবিশ্ব, নক্ষত্র এবং প্রকৃতির এমন কিছু বর্ণনা রয়েছে, যা দেড় হাজার বছর আগে মানুষের চিন্তার বাইরে ছিল। বর্তমানে আধুনিক বিজ্ঞান ও উন্নত টেলিস্কোপের মাধ্যমে যেসব মহাজাগতিক সত্য উন্মোচিত হচ্ছে, কোরআনে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় সেগুলোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বিশেষ করে মহাকাশ নিয়ে তিনটি প্রধান তথ্যের কথা এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত, মহাবিশ্বের ক্রমাগত সম্প্রসারণের বিষয়টি। এক সময় বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের ধারণা ছিল মহাবিশ্ব স্থির এবং এর আকার অপরিবর্তিত। কিন্তু ১৯২৯ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল প্রমাণ করেন যে, গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞানের এই 'এক্সপান্ডিং ইউনিভার্স' তত্ত্বের কথা কোরআনের সুরা জারিয়াতের ৪৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে আল্লাহ বলেন, 'আমি স্বীয় ক্ষমতায় আকাশ নির্মাণ করেছি এবং আমিই এর সম্প্রসারণকারী।' বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির তার তাফসিরুল কুরআনিল আজিম-এ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন যে, এর অর্থ হলো আকাশকে পৃথিবীর ওপর অত্যন্ত বিশাল এবং প্রশস্ত করে স্থাপন করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মহাজাগতিক বস্তুসমূহের নিজস্ব কক্ষপথে বিচরণ। প্রাচীনকালে বিশ্বাস করা হতো পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারপাশে ঘোরে। পরবর্তীতে ধারণা করা হয় সূর্য স্থির। তবে আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে, সূর্য তার পুরো সৌরজগৎ নিয়ে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, সূর্য ও চাঁদ প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করছে। আল-কুরতুবি তার তাফসির গ্রন্থে 'ইয়াসবাহুন' শব্দটিকে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন যে, মহাকাশের বস্তুগুলো শূন্যে স্থির নয়, বরং পানিতে সাঁতার কাটার মতো এক ধরনের গতিশীল অবস্থায় ভেসে থাকে বা চলে।
তৃতীয়ত, মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং প্রাথমিক সংযুক্ত অবস্থা। বিজ্ঞানের 'বিগ ব্যাং' বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব অনুযায়ী, সৃষ্টির শুরুতে পুরো মহাবিশ্ব একটি অতি-ঘন ও উত্তপ্ত বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল, যা পরে বিস্ফোরণের মাধ্যমে আলাদা হয়ে বর্তমান মহাবিশ্বের রূপ নেয়। কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে এই চিত্রটি ফুটে উঠেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে আসমান ও জমিন এক বিন্দুতে মিশে ছিল এবং পরবর্তীতে আল্লাহ তাদের আলাদা করে দিয়েছেন। ইমাম তাবারি তার জামিউল বয়ান ফি তাফসিরিল কুরআন-এ ব্যাখ্যা করেছেন যে, সৃষ্টির প্রারম্ভে আকাশ ও পৃথিবী পরস্পর জোড়া লাগানো ছিল এবং পরবর্তীতে শক্তির মাধ্যমে তাদের মাঝে শূন্যস্থানের সৃষ্টি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কোরআনে বর্ণিত এসব বৈজ্ঞানিক নিদর্শন প্রমাণ করে যে, এই গ্রন্থ কোনো মানুষের লেখা হতে পারে না। বরং এটি এমন এক সত্তার পক্ষ থেকে আগত, যিনি এই বিশাল মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক।




