প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে শহর রক্ষা বাঁধ ও সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগ, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। গতকাল রোববার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পাশাপাশি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা)।
সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় ১.২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে কক্সবাজার পৌরসভা। সরেজমিনে দেখা গেছে, সমুদ্রতীর সংলগ্ন বালিয়াড়ি ভরাট করে দক্ষিণ দিকে প্রায় এক কিলোমিটার সড়কের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাত-আট দিন ধরে কাজ চলছে এবং এরপর গাইডওয়াল ও ঢালাইয়ের কাজ শুরু হবে।
বালু দিয়ে ভরাটের কারণে সবুজ সাগরলতা চাপা পড়েছে এবং খননযন্ত্র দিয়ে বালুর স্তূপ সমান করতে গিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বড় বড় বালুর টিবি (ডেইল) খননযন্ত্র দিয়ে কেটে সমান করে ফেলা হয়েছে, যা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূল ও লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল রক্ষা করত। সড়কের পশ্চিম পাশে মাত্র ৪০-৫০ ফুট দূরত্বে সাগর থাকায় জোয়ারের সময় পানি বাঁধে এসে লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, ইসিএ এলাকায় বড় ধরনের সড়ক প্রকল্পের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও তা নেওয়া হয়নি। প্রকল্প পরিচালক ও পৌরসভাকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে নথি উপস্থাপনের নোটিশ পাঠানো হয়েছে; জবাব না পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহীন মিয়া দাবি করেন, নিয়ম মেনেই কাজ চলছে এবং ছাড়পত্রের বিষয় পৌরসভা জানেন। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়া জানান, ছাড়পত্র নিয়েই কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত; তবে পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকলে প্রকল্পটি কীভাবে একনেকে পাস হলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ইসিএ এলাকা হিসেবে ঘোষিত, যেখানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করে এমন স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান মুজিবুল হক বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রাকৃতিক উপায়ে সৈকতে বালুর টিবি সৃষ্টিতে কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, অথচ এখানে সড়ক প্রকল্পের নামে সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে।
বাপা কক্সবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, সৈকতে স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ এবং ২০১৩ সালের মহাপরিকল্পনায় জোয়ার-ভাটার লাইন থেকে প্রথম ৩০০ মিটার ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ হিসেবে চিহ্নিত; সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। তিনি কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। বাপার স্মারকলিপিতে সড়ক নির্মাণ বন্ধ, হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দায়ীদের আইনানুগ শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। বাপার সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ বলেন, দেশের অমূল্য সম্পদ এই সৈকত রক্ষায় প্রয়োজনে কক্সবাজারবাসীকে নিয়ে সড়ক নির্মাণ বন্ধ করা হবে।
বেলার আইনি নোটিশে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ আটজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রকল্প বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সালে এই এলাকা ইসিএ ঘোষণার মাধ্যমে উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট সৈকত রক্ষায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ৩০০ মিটার এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে সড়ক নির্মাণের ফলে সৈকতের প্রাকৃতিক ঢাল ধ্বংস হচ্ছে এবং সাগরলতা ও লাল কাঁকড়ার মতো জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। নোটিশে ভরাট করা বালিয়াড়ি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসস্থল পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাঁচ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ জানাতে বলা হয়েছে; অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।




