সোমালিয়ার রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে যখন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহাম্মদ-এর মেয়াদ বৃদ্ধির পদক্ষেপকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছে। আদালতের এই রায়ের ফলে প্রেসিডেন্সি এবং বিচার বিভাগের মধ্যে এক চরম সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বৃহস্পতিবার আদালত জানায়, প্রেসিডেন্ট তাঁর চার বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যে সময়সীমা বৃদ্ধি করেছিলেন, তা আইনত বৈধ নয়। উল্লেখ্য, গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-এর চার বছরের কার্যকাল শেষ হয়েছিল, তবে মার্চ মাসে পার্লামেন্টে অনুমোদিত কিছু আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে তাঁর মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হয়।
এই রায়ের ঠিক একদিন আগে প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহাম্মদ প্রধান বিচারপতি বাশে ইউসুফ আহমেদ-কে বরখাস্ত করেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই পদক্ষেপকে প্রত্যাখ্যান করে এবং জানায় যে, প্রধান বিচারপতিকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো আইনি ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই। আদালতের মতে, প্রধান বিচারপতির অপসারণ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ 'বাতিল ও অকার্যকর'। প্রেসিডেন্সি পক্ষ দাবি করেছিল যে, বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আদালত স্পষ্টভাবে জানায় যে, প্রধান বিচারপতিকে কেবল সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অপসারণ করা সম্ভব এবং প্রেসিডেন্টের এই কাজ বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার শামিল। প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে ইব্রাহিম আইডল সুলেইমানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
আদালত আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আগামী ৩০ দিনের মধ্যে একটি নির্বাচনী পরিকল্পনার বিষয়ে একমত হবেন এবং ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করবেন। এই নির্দেশের ফলে আগামী বছরের জন্য সরকারের নির্ধারিত দেশব্যাপী নির্বাচনের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৫ এপ্রিল সংসদীয় নির্বাচন এবং তার এক মাস পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। তবে পনটল্যান্ড এবং জুবিল্যান্ডের আঞ্চলিক প্রশাসনসহ বিরোধী দলগুলো এই সময়সূচি প্রত্যাখ্যান করেছে।
প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ দাবি করেছেন যে, গোত্র-ভিত্তিক প্রতিনিধি নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তে পূর্ণ গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য এই সংস্কারগুলো অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, তিনি কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যই সংবিধান পরিবর্তন করেছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট শরীফ শেখ আহমেদ এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, দেশ বর্তমানে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখে এবং প্রেসিডেন্টের উচিত সবার সাথে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে এগোানো। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসান আলী খায়রে আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট সুপ্রিম কোর্টে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করেছেন, যা আইনের শাসনের জন্য সরাসরি হুমকি। যদিও এএফপি (AFP) এই নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েনের খবরটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি, তবে স্থানীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে আদালত প্রাঙ্গণে সশস্ত্র সদস্যদের দেখা গেছে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সোমালিয়া এখনও আল-শাবাব নামক ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে লড়াই করছে, যারা দেশের গ্রামীণ এলাকার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বেড়েছে কারণ আফ্রিকান ইউনিয়ন মিশনে সবচেয়ে বেশি সেনা প্রদানকারী দেশ উগান্ডা চলতি বছরের শেষ নাগাদ তাদের সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। এই অচলাবস্থা নিরসনে প্রেসিডেন্ট ১৪ থেকে ১৮ নভেম্বরের মধ্যে জাতীয় আলোচনার আহ্বান জানালেও, বিরোধী নেতারা তাঁর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।




