শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কৃষিখাতে সমতা নিশ্চিত করতে মোট ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে গেটস ফাউন্ডেশন। এই বিশাল অঙ্কের বরাদ্দের ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৪০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হবে স্কুলগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির প্রসারে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রেণিকক্ষে ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে এআই টিউটরিং ব্যবস্থা চালু করা। ২০৪৫ সালের মধ্যে প্রায় ১ কোটি মানুষকে কার্যকর পেশাদার সনদ অর্জনে সহায়তা করার বৃহত্তর মার্কিন শিক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে এই বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে অনেক বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কম্পিউটারভিত্তিক মূল্যায়নের ব্যাপক প্রসারের পর কিছু শিক্ষার্থীর পরীক্ষার ফলাফল হ্রাস পেয়েছে। এমনকি নিউরোসায়েন্টিস্ট জ্যারেড কুনী הורভাথ মার্কিন সিনেট কমিটিতে সাক্ষ্য দিয়ে জানান যে, পাঠ্যবইয়ের বদলে ল্যাপটপ ব্যবহারের ফলে জেন-জি (Gen Z) প্রজন্মের संज्ञानात्मक বা জ্ঞানীয় ক্ষমতা পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় কমেছে। তাঁর মতে, বিচার-বিবেচনাহীন ডিজিটাল প্রসারের ফলে শেখার পরিবেশ শক্তিশালী হওয়ার বদলে দুর্বল হয়েছে।

এই সংশয়ের প্রভাব ইতিমধ্যে নীতি-নির্ধারণে দৃশ্যমান। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি এবং স্কুল চ্যান্সেলর কামার সামুয়েলস সম্প্রতি ২-কে থেকে অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য জেনারেটিভ এআই-এর ব্যবহারে এক বছরের স্থগিতাদেশ (moratorium) ঘোষণা করেছেন। মেয়র মামদানির মতে, প্রযুক্তি শিল্প এআই-চালিত প্রাথমিক শিক্ষাকে অপরিহার্য বলে বোঝাতে চাইলেও তারা তা মেনে নেননি। এই এক বছর তারা প্রযুক্তির প্রকৃত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করবেন।

অন্যদিকে, গেটস ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তাদের এই পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাজানো হয়েছে। নিম্ন আয়ের শিক্ষার্থীদের অধিক অধ্যুষিত স্কুলগুলোতে প্রথমে এই টুলগুলো পরীক্ষা করা হবে, শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং স্বাধীন গবেষকদের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস এক বিবৃতিতে বলেছেন, বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দিলে উন্নত প্রযুক্তির সুবিধা কেবল ধনীরাই পায়, তাই প্রান্তিক মানুষের কাছে এই সুবিধা পৌঁছে দিতেই এই বিনিয়োগ।

শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এআই-এর ভূমিকা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ক্রিমসন গ্লোবাল একাডেমির প্রিন্সিপাল সিয়োভান কেসি মনে করেন, পাঠ পরিকল্পনা বা প্রশাসনিক কাজে এআই সহায়ক হলেও এটি শিক্ষককে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। তথ্যের সঠিকতা যাচাই এবং শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক চ্যালেঞ্জ নিশ্চিত করতে শিক্ষকের অভিজ্ঞতা অপরিহার্য। আবার ফ্লোরিডার পেপিন একাডেমির শিক্ষক অ্যামি ম্যাকব্রাইড সতর্ক করে বলেছেন, কেবল টুল সরবরাহ করলেই হবে না, সেটি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও প্রশিক্ষণের অভাব থাকলে এটি ডিজিটাল বিভাজন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

এডটেক প্ল্যাটফর্ম 'ইমাজি'-র সিইও ডোরা পালফি মনে করেন, যেসব স্কুল সবচেয়ে দরিদ্র, তারা হয়তো প্রাথমিক সাক্ষরতা ও গণিতের সমস্যা সমাধান না করে এআই গ্রহণ করতে সক্ষম হবে না। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা অর্জিত হওয়ার বদলে সক্ষম ও অক্ষম স্কুলের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়বে। অনলাইন লরেল স্প্রিংস স্কুলের ইতিহাস শিক্ষক সালেনা ডেভিস মনে করেন, এআই-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল সাময়িক হতে পারে এবং যাদের মৌলিক জ্ঞান কম, তারা এআই-এর ভুল তথ্য সহজেই বিশ্বাস করে নিতে পারে।

তবে সব নেতিবাচকতা নেই। কিছু শিক্ষক লক্ষ্য করেছেন যে, এআই তাদের পাঠ উপকরণ তৈরিতে সময় বাঁচিয়েছে, যা তাদের শিক্ষার্থীদের শেখানোর জন্য আরও বেশি সময় দিচ্ছে। গেটস ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র জানিয়েছেন, জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা এই পাইলট প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন করবেন। সামগ্রিক নম্বরের চেয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা কতটা দ্রুত মূল ধারায় ফিরতে পারছে, তার ওপর ভিত্তি করেই এই প্রকল্পের সফলতা পরিমাপ করা হবে।