আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১ নম্বর ট্রাইব্যুনাল কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)-র সাবেক প্রধানসহ পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গ্রহণ করেছে। রোববার বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন এই ট্রাইব্যুনাল মামলার পলাতক চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। মামলার অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সিটিটিসির সাবেক প্রধান ও ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান, সাবেক এডিসি ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে জন, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান ওরফে হিরা, সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মো. মেজবাহ উদ্দিন আহাম্মেদ এবং সাবেক এসআই তৌহিদুল ইসলাম সুমন। গ্রেপ্তার থাকা আসামি ইশতিয়াক আহমেদকে আগামী ২২ অক্টোবর আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, তৎকালীন সরকারের সমালোচক বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হতো। তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় করা হতো এবং সেই সাজানো জবানবন্দি ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে রেকর্ড করানো হতো। পরবর্তীতে তাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে এবং সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে মিথ্যা অস্ত্র মামলা দেওয়া হতো বলে তিনি অভিযোগ করেন। গত ১৬ সেপ্টেম্বর রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে র্যাব, ডিজিএফআই, ডিবি, এনএসআই ও সিটিটিসি-র মতো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধী রাজনৈতিক দল, মানবাধিকারকর্মী এবং সরকার সমালোচকদের দমনে ব্যাপক ও পদ্ধতিগতভাবে গুম, অপহরণ ও হত্যা চালানো হয়েছে। ২০১৬ সালে গঠিত সিটিটিসি ইউনিটটি পরবর্তীতে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ না করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে ব্যবহৃত হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের সিটিটিসি কার্যালয়ের নির্জন কক্ষে চোখ বেঁধে রাখা, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং ছাদে ঝুলিয়ে মারধরের মতো গুরুতর নির্যাতন চালানো হতো।
মামলার তথ্যানুযায়ী, 'অপারেশন স্টর্ম-২৬', 'অপারেশন হিট স্ট্রং', রূপনগর, টাঙ্গাইল, পাতারটেক ও 'অপারেশন ঈগল হান্ট'-এর মতো বিভিন্ন অভিযানে মোট ২৮ জন ইসলামপন্থী ও ভিন্নমতাবলম্বীকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মো. ফখরুল ইসলাম, তার ছেলে সাইফুল ইসলামসহ আরও চারজনকে অপহরণ করে সিটিটিসি কার্যালয়ের সপ্তম তলার গোপন বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাদের পরে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে মাদ্রাসা ইবনে মাসউদের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন আল-আমিনের হত্যাকাণ্ডের কথা। অভিযোগ করা হয়, ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে অপহরণ করে সিটিটিসি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুম করে নির্যাতন করা হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে তার মৃত্যু হলে, হত্যার প্রমাণ লুকাতে তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামানের নির্দেশে এবং এডিসি ইশতিয়াকের নেতৃত্বে তার লাশ কেরাণীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। তদন্তে আসামিদের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়েছে। এই অপরাধগুলো রোধে তারা কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং অধীনস্থদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।




