সিলেট নগরকেন্দ্রিক বিএনপির অভ্যন্তরীণ রেষারেষি ও দলাদলি এখন আর গোপন নেই, বরং তা প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি কার্যত বর্জন করেছে মহানগর বিএনপি, যা দলের মধ্যকার ফাটলকে আরও প্রকট করে তুলেছে। সিটি প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর বিরুদ্ধে 'স্বেচ্ছাচারিতার' অভিযোগ এনে মহানগর বিএনপির অনেক নেতা এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেননি। তবে বিমানবন্দর বরণসহ অন্যান্য কর্মসূচিতে তাঁদের উপস্থিতি ছিল। রেজাউল হাসান কয়েস লোদী এই অনুপস্থিতির কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, যারা আন্দোলন-সংগ্রামে নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের বড় অংশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি, তাই বিবেকগত কারণে তিনি অনুষ্ঠানে যাননি। অন্যদিকে, আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বিষয়টিকে দলীয় সংঘাত হিসেবে না দেখে সিটি করপোরেশনের নিজস্ব আয়োজন হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নেতাকর্মীদের মধ্যে এই বিভক্তির মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন। মেয়র পদের দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে বিএনপি ও অঙ্গ-সংগঠনের অন্তত আটজন নেতা এখন সক্রিয়। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এবং প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুসারীরা প্রভাবশালী। তবে সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ূন কবীরের অনুসারীরাও একটি শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন সিটি প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাছিম হোসেইন এবং সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী। এছাড়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকী এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামানও এই দৌড়ে শামিল।
নেতাদের মধ্যকার এই সম্পর্কের টানাপোড়েন কেবল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই নয়, বরং বিভিন্ন কর্মসূচিতেও দৃশ্যমান। গত ১ সেপ্টেম্বর মহানগর বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধনের সময় আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, কয়েস লোদী এবং ইশতিয়াক আহমেদ সিদ্দিকীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এর আগে ২০২৫ সালের ২০ মে কয়েস লোদী ও ইমদাদ হোসেন চৌধুরীর মধ্যকার তীব্র বাক্যযুদ্ধ এবং গত বছরের ডিসেম্বরে নাছিম হোসেইনের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লোদীর অনুসারীদের মাধ্যমে হেনস্থার ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় নেতাদের মতে, ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনে মনোনয়ন না পাওয়া এবং পরবর্তীতে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর সিটি প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টিও এই দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কাজ করছে। মহানগর বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, কাইয়ুম চৌধুরীর প্রশাসক নিয়োগটি প্রত্যাশিত ছিল না, যার ফলে আগে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থাকা অনেক নেতা এখন দূরত্ব বজায় রাখছেন। সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো বা না জানানোর বিষয়টি হয়তো বাহ্যিক কারণ, তবে মূল সমস্যাটি সিটি নির্বাচনের মনোনয়ন কেন্দ্রিক রেষারেষি।




