রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত প্রথম আলো কার্যালয়ে সম্প্রতি ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা: সমন্বিত আইনের প্রয়োজনীয়তা’ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় ব্লাস্ট ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, অধিকারকর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা একমত হন যে, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে এমন একটি সমন্বিত আইন প্রয়োজন যা সমাজের সব স্তরের ও সব পেশার মানুষের জন্য সমানভাবে কার্যকর হবে। তারা প্রস্তাব করেন, অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে তদন্ত এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে এবং পুরো কাঠামোটিকে জবাবদিহিমূলক ও ভুক্তভোগীবান্ধব হতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, যৌন হয়রানি রোধে যে খসড়া আইনটি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ হয়েছে, তা দ্রুত সংসদে পাস করা জরুরি। তবে তাঁর মতে, কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং তা কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তিনি মনে করেন, কোনো কাজকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করলে মানুষ তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে না। তাই প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে যৌন হয়রানি কমাতে আর্থিক দণ্ড আরোপ এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করার সুযোগ রাখা একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে।
ব্লাস্টের লিগ্যাল স্পেশালিস্ট আয়েশা আক্তার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় উল্লেখ করেন, ২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি রোধে যুগান্তকারী নির্দেশনা দিয়েছিলেন। যদিও এই নির্দেশনাগুলো একটি আইনি কাঠামো হিসেবে কাজ করছে, তবে সব ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়নি। ফলে পোশাক শিল্প, মাদ্রাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সুরক্ষা দিতে একটি পূর্ণাঙ্গ আইনের প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, নতুন আইনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তবে বর্তমানেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হাইকোর্টের বিদ্যমান নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এই বিষয়ে সরকারের ওপর সমন্বিত চাপ তৈরি করতে শ্রমজীবী নারী, শিক্ষার্থী, আইনজীবী এবং অধিকারকর্মীদের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফওজিয়া করিম ফিরোজ জানান, দীর্ঘদিনের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়নে বাধা এসেছে। তাঁর মতে, বিচারক, আইনজীবী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও ধারণা না থাকলে নারী ও শিশু নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতা আইনের মতো যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন কার্যকর করা কঠিন হবে। অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাসলিমা ইয়াসমিন জানান, ২০১৮ সাল থেকে এই আইন নিয়ে আলোচনা চলছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি খসড়া অনেক দূর এগিয়েছিল, কিন্তু নির্বাচনের কারণে তা অধ্যাদেশ হিসেবে কার্যকর হয়নি।
ইউএন উইমেনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার শ্রবণা দত্ত মনে করেন, কেবল কমিটি গঠন বা নীতিমালা তৈরি যথেষ্ট নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এর পাশাপাশি ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলেন তিনি যাতে প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হয়রানি মোকাবিলা করা যায়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কারিশমা জাহান উল্লেখ করেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনে যৌন হয়রানির সব ধরন মোকাবিলার মতো বিস্তৃত কাঠামো নেই এবং অনেক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।
নারী শ্রমিক কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম অনানুষ্ঠানিক খাতের নারীদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই খাতের নারীরা অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও হয়রানির শিকার হলে বর্তমান আইনে তাঁদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা বা প্রতিকার নেই। একইভাবে উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি বলেন, পূর্ণাঙ্গ আইন হওয়ার আগ পর্যন্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোকেই সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে।
বৈঠকে ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজমান হতাশার কথা বলেন। তাঁর মতে, প্রতিকার পাওয়ার আশা না থাকায় অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করতে চান না। তাই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা প্রয়োজন যাতে তারা অভিযোগ করার সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে পারে। ব্লাস্টের পরিচালক মাহবুবা আক্তার অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর মানসুরা হোসাইন, ফিরোজ চৌধুরী এবং সুমনা শারমীন।




