চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব দর্শক ছাড়া ভাবা যায় না। সত্যজিৎ রায়ের মতে, একজন পেইন্টার বা কবি তাঁর সৃষ্টি নিজের কাছেই রাখতে পারেন, কিন্তু চলচ্চিত্রের প্রকৃত জীবন শুরু হয় দর্শকের সামনে উপস্থাপনের মাধ্যমে। দর্শকের সম্পর্কে নানা ধারণা প্রচলিত—কেউ মনে করেন দর্শক যা দেওয়া হয় তাই গ্রহণ করে, তাঁদের কোনো ক্ষমতা নেই; আবার কেউ ভাবেন, দর্শককে খুশি করতে হলে শিল্পকে 'সস্তা' করতে হয়। সত্যজিৎ দর্শকপ্রিয়তার বিরোধী ছিলেন না, তবে তিনি বিশ্বাস করতেন না যে সিনেমাকে জনপ্রিয় করতে গেলে মানহীন হতে হবে। তাঁর মতে, দর্শকের বুদ্ধি আছে, তাঁদের বোকা ভাবার অবকাশ নেই। তিনি বলতেন, দর্শক যা দেখে তা তাঁদের জানা তথ্যের চেয়ে ভালো বুঝতে পারে; নির্মাতার কাছে কেবল একটি ক্যামেরা আছে, দর্শকের তা নেই। সুযোগ পেলে কোনো দর্শক হয়তো নির্মাতার চেয়ে ভালো ছবিও বানাতে পারবেন। এই কারণে ইরানি নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি তাঁর ছবিতে এমন খোলা জায়গা রাখতেন, যেন দর্শক নিজের মতো করে অর্থ নির্মাণ করতে পারেন।
চলচ্চিত্রের ইতিহাস প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের অবস্থানও বদলে দিয়েছে। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ব্রাদার্সের 'আ ট্রেন অ্যারাইভাল' প্রদর্শনের সময় দর্শকেরা ট্রেনের দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন—এমন কাহিনি প্রচলিত, যদিও এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে। তখনকার ছোট ছোট দৃশ্য, যেমন শিশুর খাওয়া বা শ্রমিকের কারখানা থেকে বেরোনো, দর্শককে বিস্মিত করত। সে সময় সিনেমাকে বলা হতো 'রিল', আজকের ফেসবুক রিলের মতোই সংক্ষিপ্ত। গল্পের চেয়ে দৃশ্যই মুখ্য ছিল। তবে জর্জ মেলিয়েঁ 'ভ্যানিশিং লেডি' (১৮৯৬) দিয়ে দর্শককে জাদুর জগতে নিয়ে যান, আর 'আ ট্রিপ টু দ্য মুন' (১৯০২) দিয়ে সায়েন্স ফিকশনের পথ দেখান। দর্শক কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করতে থাকে।
ক্ল্যাসিক্যাল হলিউড সিনেমা দর্শককে ধারাবাহিক গল্পের ভেতরে টেনে নেয়, যেখানে দর্শক নায়কের সুখ-দুঃখকে নিজের করে নেয়। ডি ডব্লিউ গ্রিফিথের চলচ্চিত্রভাষা এই প্রবণতাকে শক্তিশালী করে। দর্শক তখন অনেকাংশে আবেগপ্রবণ পর্যবেক্ষক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে সোভিয়েত পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইন মন্তাজ ব্যবহার করে দর্শকের মগজে বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তাঁর 'ব্যাটলশিপ পটেমকিন' (১৯২৫)-এর সিঁড়ির দৃশ্যে শটের সংঘর্ষের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক অর্থ সৃষ্টি করেন। আইজেনস্টাইনের কাছে দর্শক ছিলেন একজন সক্রিয় চিন্তক, যাঁর মনকে জাগিয়ে তোলাই মন্তাজের লক্ষ্য।
বার্টল্ড ব্রেখট চেয়েছিলেন দর্শক যেন আবেগে ভেসে না গিয়ে দূরত্ব বজায় রাখে এবং সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাঁর এই 'এলিয়েনেশন ইফেক্ট' পরবর্তীকালে জঁ-লুক গদার, মৃণাল সেন এবং কিয়ারোস্তামির কাজে দেখা যায়। কিয়ারোস্তামি তাঁর চলচ্চিত্রে বারবার দর্শককে মনে করিয়ে দিতেন যে এটি একটি নির্মিত কাহিনি। তিনি বলতেন, 'আমি দর্শকের আবেগ নিয়ে খেলতে চাই না।' 'টেস্ট অব চেরি' ছবিতে তিনি ক্যামেরার উপস্থিতি দেখিয়ে দর্শককে দূরত্ব রাখতে উৎসাহিত করেন, যেন তারা সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে পারে।
আলফ্রেড হিচকক দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করেন। 'রিয়ার উইন্ডো' (১৯৪৫)-এ নায়ক জেফ প্রতিবেশীদের গোপন জীবন পর্যবেক্ষণ করে; দর্শকও তার সঙ্গে সেই ভয়ারিস্টিক দৃষ্টিতে যোগ দেয়। অর্থাৎ সিনেমা দেখার প্রক্রিয়াটিই এক ধরনের গোপন দর্শন। লরা মালভি তাঁর 'ভিজ্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা' প্রবন্ধে দেখান, ক্ল্যাসিক্যাল হলিউড সিনেমা জেন্ডার নিরপেক্ষ নয়—পুরুষ চরিত্র 'দেখার' ক্ষমতা রাখে, আর নারী চরিত্র 'দৃশ্যবস্তু' হয়ে ওঠে। বলিউডের 'তাল' (১৯৯৯) ছবিতে নায়ক গোপনে নায়িকার নাচ দেখে; এখানে পুরুষ দর্শকই কেবল নয়, নারী দর্শককেও পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বাধ্য করা হয়। মেল গেজের ধারণা অনুযায়ী, নারী মডেল বা অভিনেত্রীকে যখন মোটা বলে সমালোচনা করা হয়, তখন নারী দর্শকরাও সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেন।
অন্যদিকে আন্দ্রে বাজাঁ বিশ্বাস করতেন, বাস্তবতার কাছে গেলে দর্শক স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারবেন। লোকেশন, অ-পেশাদার অভিনেতা, স্বাভাবিক আলো—এসব দর্শককে গল্পের প্রেক্ষাপট বুঝতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের যুবরাজ শামীমের 'আদিম' (২০২৩) ছবিটি টঙ্গীর বস্তিতে শুট করা এবং সেখানকার মানুষদের অভিনয় করানো হয়েছে, ফলে দর্শক বাস্তবতার কাছাকাছি যেতে পারে। কামার আহমাদের 'অন্যদিন' (২০২৫) ছবিটিও দর্শকের মনে নানা চিন্তার জন্ম দেয়, যা প্রত্যেকে নিজের মতো মিলিয়ে নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, চলচ্চিত্রের অর্থ কি পরিচালকের উদ্দেশ্যই নির্ধারণ করে? ১৯৬৭ সালে রোলাঁ বার্থ তাঁর 'দ্য ডেথ অব দ্য অথর' প্রবন্ধে বলেন, লেখকের (এখানে পরিচালকের) ইচ্ছার চেয়ে পাঠকের (দর্শকের) অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, জেন্ডার, শ্রেণি, বয়স—সবকিছু মিলিয়ে অর্থ তৈরি হয়। একটি ছবি কারও কাছে প্রেমের গল্প, কারও কাছে জেন্ডার রাজনীতির বিশ্লেষণ হয়ে ওঠে। তাই দর্শকের চোখই চলচ্চিত্রের চূড়ান্ত অর্থ গঠন করে।




