আজ ২১ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬ সালে ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী নূরজাহানের জন্মশত বছর পূর্ণ হলো। একটি সংগীত পরিবারে জন্ম নেওয়া নূরজাহান মাত্র ছয় বছর বয়সে গানের তালিম শুরু করেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁর কণ্ঠে প্রখর সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন, যা খুব দ্রুতই বাস্তব রূপ নেয়। শিশুশিল্পী হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু হয় কলকাতার মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে। ১৯৩৫ সালে 'পিন্ড দি কুড়ি' ছবির মাধ্যমে তিনি ক্যামেরার সামনে আসেন এবং 'বেবি নূরজাহান' নামে পরিচিতি লাভ করেন। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয় এবং ১৯৩৮ সালে 'গুল বাকাওলি' ছবির গানের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরিচিতি পান।

নূরজাহানের জীবনের এক বড় মোড় আসে যখন তিনি মুম্বাইয়ে পৌঁছান। সেখানে তিনি কেবল গায়িকা হিসেবে নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯৪২ সালের 'খানদান' ছবিটির মাধ্যমে তিনি বড় তারকার মর্যাদা পান। পরবর্তীতে 'জিনাত', 'আনমোল ঘড়ি' এবং 'জুগনু'র মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তা তুঙ্গে নিয়ে যান। বিশেষ করে ১৯৪৭ সালে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় এবং 'বুলবুলো মাত রো' গানের মতো সৃষ্টি তাঁকে তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সারির নায়িকাদের একজন করে তোলে।

তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেয়। স্বামী ও পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাকিস্তানে পাড়ি জমান। সেই সময়ে পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্প একদম প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। সেখানে নূরজাহান শূন্য থেকে শুরু করলেও তাঁর মুম্বাইয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত প্রভাব বিস্তার করেন। ১৯৫১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'চানভে' ছবির মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে ইতিহাস গড়েন। এই ছবিতে তিনি অভিনয় এবং সংগীতের পাশাপাশি পরিচালনার দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে নূরজাহান একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বুঝতে পারেন মানুষ তাঁর অভিনয়ের চেয়ে কণ্ঠের প্রতি বেশি আগ্রহী। ফলে ১৯৫৯ সালের পর তিনি অভিনয় জীবন থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি সংগীত ও গজলশিল্পে মনোনিবেশ করেন। এই সময়েই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় 'মালিকা-ই-তারান্নুম' বা সুরের রানি উপাধি। পেশাগত ক্ষেত্রে তাঁর দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। যখন তৎকালীন অন্যান্য গায়িকারা একটি গানের জন্য ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, নূরজাহান দাবি করতেন প্রায় ২ হাজার রুপি—যা ছিল অন্যদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস এবং বাণিজ্যিক মূল্যের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও আপসহীন।

ব্যক্তিগত জীবনে নূরজাহানের অভিজ্ঞতা ছিল ঘটনাবহুল। ১৭ বছর বয়সে শওকত হুসেইন রিজভিকে বিয়ে করলেও পরবর্তীতে তাঁদের দাম্পত্য বিচ্ছেদ ঘটে। ১৯৫৯ সালে তিনি অভিনেতা এজাজ দুররানিকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। ছয় সন্তানের জননী হয়েও তিনি তাঁর পেশাগত পরিচয় ও সৃজনশীলতাকে ধরে রেখেছিলেন। সংগীতের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান ছিল কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার সাথে সমন্বয় করা। ফয়েজের 'মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত' গানটি তাঁর কণ্ঠে এক নতুন মাত্রা পায়। এছাড়া ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় দেশাত্মবোধক গানের মাধ্যমে তিনি পাকিস্তানি জনসাধারণের মধ্যে জাতীয় আবেগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

নূরজাহানের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল লতা মঙ্গেশকরের মতো বিশ্ববরেণ্য শিল্পীরও। লতা নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে নূরজাহান তাঁর আদর্শ এবং ছোটবেলা থেকেই তাঁর গান শুনে বড় হয়েছেন। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮২ সালে নূরজাহান ভারতে সফর করেন, যা তাঁর পুরোনো শ্রোতাদের সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। উর্দু, পাঞ্জাবি ও সিন্ধি ভাষায় প্রায় ১০ হাজার গান রেকর্ড করেছেন বলে সরকারি সূত্রে জানা যায়। শৈশব থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের শেষ রেকর্ডিং পর্যন্ত তিনি সংগীতের সাথেই মিশে ছিলেন। ২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে ৭৪ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে।