শিশুর বারবার পেটের সমস্যা কিংবা ত্বকের অ্যালার্জির পেছনে ‘লিকি গাট’ বা অন্ত্রের অতিরিক্ত ভেদ্যতা দায়ী হতে পারে। সাধারণত মানবদেহের ক্ষুদ্রান্ত্র খাবার হজম করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অন্ত্রের দেয়ালে থাকা কোষগুলোর মধ্যে ‘টাইট জাংশন’ নামক এক বিশেষ সংযোগ থাকে, যা শরীরের জন্য দরকারি পুষ্টি প্রবেশ করতে দেয় এবং ক্ষতিকর উপাদানগুলোকে আটকে রাখে। তবে কোনো কারণে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে অন্ত্রের তরল শোষণের ক্ষমতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অন্ত্রের অতিরিক্ত ভেদ্যতা এবং সাধারণ ভাষায় ‘লিকি গাট’ বলা হয়।

গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কারণে অন্ত্রের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে অন্ত্রের প্রদাহ বা সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিপাকতন্ত্রের রোগ, নিয়ম বহির্ভূতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, এবং খাদ্যাভ্যাসে অতিরিক্ত চিনি, পরিশোধিত শর্করা ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের আধিক্য। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। লিকি গাটের ফলে শিশুদের মধ্যে গ্যাস, পেট ফাঁপা, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে গবেষকরা মনে করেন, অটিজম, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ কিংবা এডিএইচডি-র মতো স্নায়বিক সমস্যার পেছনে লিকি গাট সরাসরি দায়ী—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

অনেকের ধারণা গ্লুটেন, সয়া বা দুধ সব শিশুর জন্যই ক্ষতিকর, যা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া শিশুর ডায়েট থেকে গ্লুটেন বা দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিলে পুষ্টির মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তবে শিশুর উচ্চতা বা ওজন বৃদ্ধি আশানুরূপ না হলে, দীর্ঘস্থায়ী বমি বা রিফ্লাক্স, একজিমা কিংবা মলদ্বার দিয়ে রক্তপাতের মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত শিশু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।

শিশুর অন্ত্রের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পুষ্টিবিদ লিনা আকতার কিছু বিশেষ পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি জানান, শিশুর বয়স অনুযায়ী বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর খাবার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, ঘরে তৈরি সুষম খাবার যেমন— মাছ, ডিম, ডাল, ভাত, রুটি এবং শাকসবজি খাদ্যতালিকায় নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোমল পানীয় ও চিপসের মতো প্রসেসড ফুড সম্পূর্ণভাবে বর্জন করতে হবে। তৃতীয়ত, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার কার্যকারিতা বাড়াতে পর্যাপ্ত ফাইবার বা খাদ্যআঁশ সমৃদ্ধ খাবার এবং নিয়মিত পানি পানের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পরিশেষে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করা এবং শিশুর পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলে অন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব।