২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ উদযাপিত হচ্ছে, যার এবারের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় আগামীর পর্যটন’। বর্তমান সময়ে গন্তব্য নির্বাচন, হোটেল বুকিং, টিকিট সংগ্রহ কিংবা আবহাওয়ার খবরাখবর পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অ্যাপের পর্দায় একটি পর্যটন কেন্দ্রকে আকর্ষণীয় দেখালেও বাস্তবে সেখানে পৌঁছালে পর্যটকরা প্রায়ই যানজট, অতিরিক্ত ভাড়া, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিরাপত্তার অভাবের মতো সমস্যার সম্মুখীন হন। ফলে ভ্রমণের শুরুতে যে আনন্দ থাকে, তা অনেক সময় ফেরার পথে বিরক্তিতে পরিণত হয়।

দেশের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ কক্সবাজারের উদাহরণ দিলে দেখা যায়, সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকলেও সেখানে পর্যটকদের প্রশান্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অনিয়ন্ত্রিত হকারদের আনাগোনা। সৈকতে বসে বিশ্রাম নিতে চাইলে শুরু হয় বিভিন্ন পণ্যের বিক্রেতাদের উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি, যার সঙ্গে যোগ হয় ভিক্ষুক এবং বিচ বাইকের দাপট। এই সমস্যার সমাধানে হকারদের উচ্ছেদ নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার দাবি জানানো হয়েছে। যেমন—নির্দিষ্ট বিক্রয় এলাকা নির্ধারণ, পরিচয়পত্র প্রদান এবং মূল্যতালিকা বাধ্যতামূলক করা। পাশাপাশি সৈকতের নির্দিষ্ট কিছু অংশকে ‘কোয়ায়েট জোন’ বা নীরব অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করলে পরিবারসহ আসা পর্যটকেরা স্বস্তিবোধ করবেন। এছাড়া ডিজিটাল ডিসপ্লে, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা জোরদার করা প্রয়োজন।

পর্যটন অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করতে স্থানীয় সংস্কৃতিকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ বা হিমছড়ির মতো এলাকায় সন্ধ্যার পর পর্যটকদের জন্য রাখাইন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা, স্থানীয় গান-নাচ এবং হস্তশিল্পের মেলা আয়োজন করা যেতে পারে। এতে পর্যটকদের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও লাভবান হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশে ‘কৃষি পর্যটন’ বা এগ্রো-ট্যুরিজমের এক বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। শহরের মানুষের জন্য ধানক্ষেত, ফলের বাগান বা মাছের খামার ভ্রমণের আকর্ষণীয় কেন্দ্র হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার এবং যাতায়াতের উন্নত ব্যবস্থা, যাতে কৃষকদের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন না ঘটে।

সুন্দরবন, পার্বত্য অঞ্চল, সিলেটের চা-বাগান কিংবা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে কেবল দেখার জায়গা হিসেবে নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে কানারাজার বা কুদুম গুহার মতো স্থানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং আন্তর্জাতিক স্তরে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে দেশের বৈচিত্র্য তুলে ধরা জরুরি। তবে মনে রাখতে হবে, পর্যটন উন্নয়ন মানে কেবল বিলাসবহুল হোটেল-রিসোর্ট নির্মাণ নয়; বরং পরিচ্ছন্ন টয়লেট, পর্যাপ্ত আলো, ইন্টারনেট এবং দক্ষ গাইডের ব্যবস্থা করা।

প্রযুক্তির প্রকৃত ভূমিকা হতে পারে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির মাধ্যমে, যেখানে আবাসন, পরিবহন এবং খাবারের সঠিক দামের পাশাপাশি ভিড়ের অবস্থা ও নিরাপত্তা সতর্কবার্তা পাওয়া যাবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পর্যটকদের চাহিদা বিশ্লেষণ করে সেবার মান বাড়ানো সম্ভব। তবে ডিজিটাল প্রচারণার চেয়ে মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনসংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া টেকসই পর্যটন সম্ভব নয়। পর্যটককে কেবল রাজস্বের উৎস মনে না করে তাকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিজ্ঞতা প্রদান করাই হবে প্রকৃত সাফল্য।