ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের নতুন একটি আইনের কার্যকর হওয়া ঠেকাতে আইনি লড়াই শুরু করেছে বিশ্বের শীর্ষ তিনটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান—গুগল, মেটা এবং টিকটক। ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তি কমানোর লক্ষ্যে প্রণীত এই আইনটিকে তারা অতিরিক্ত হস্তক্ষেপমূলক এবং মার্কিন সংবিধানের বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী বলে মনে করছে। এই কোম্পানিগুলোর দাবি, তাদের সন্তানদের জন্য কোন প্ল্যাটফর্ম বা কনটেন্ট উপযোগী হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ অধিকার কেবল বাবা-মায়ের থাকা উচিত।
‘অ্যাসেম্বলি বিল ১৭০৯’ নামে পরিচিত এই আইন অনুযায়ী, শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক শোষণ করতে পারে এমন কোনো ফিচার যুক্ত করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ করে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী রেকমেন্ডেশন পাঠানো এবং ‘অটোপ্লে’ ফিচারের মাধ্যমে একটানা ভিডিও দেখানোর মতো বিষয়গুলো বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এগুলো শিশুদের মানসিক আসক্তি তৈরি করে। এমনকি যেসব শিশুদের অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই এই ফিচারগুলো ছিল, সেগুলো মুছে ফেলার বাধ্যবাধকতাও আরোপ করেছে ক্যালিফোর্নিয়া সরকার। কোনো বিচারিক স্থগিতাদেশ না থাকলে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এই আইনটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
আইনি জটিলতা এড়াতে তিনটি প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদা আদালতে মামলা করেছে। গুগল স্যান হোসে, মেটা স্যান ফ্রান্সিসকো এবং টিকটক লস অ্যাঞ্জেলেসের ফেডারেল আদালতে তাদের আবেদন জানিয়েছে। তাদের যৌথ যুক্তি হলো, ক্যালিফোর্নিয়া সরকার জোর করে তাদের নিজস্ব পছন্দ কনটেন্ট উপস্থাপনার ক্ষেত্রে চাপিয়ে দিচ্ছে। তারা আরও দাবি করেছে যে, এই আইনটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা এবং ফেডারেল ‘কমিউনিকেশনস ডিসেন্সি অ্যাক্ট’-এর ‘সেকশন ২৩০’ ধারার লঙ্ঘন, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর কনটেন্টের দায়বদ্ধতা থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।
অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম ১০ সেপ্টেম্বর বিলটিতে স্বাক্ষর করার সময় শিশুদের নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, যখন অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি সন্তানদের ঝুঁকির মুখে ফেলে, তখন ক্যালিফোর্নিয়া চুপ করে বসে থাকবে না। এই আইনের বিষয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টারের দপ্তর জানিয়েছে, তারা মামলার আইনি নথিগুলো পর্যালোচনা করছেন এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখপাত্ররা তাদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। গুগলের মুখপাত্র হোসে কাস্তানেদা জানান, এই বিস্তৃত আইনটি শিশুদের জন্য বয়সোপযোগী ভিডিও খোঁজার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে। মেটা তাদের আবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ক্যালিফোর্নিয়া তাদের কোটি কোটি পোস্ট বাছাইয়ের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে না। টিকটকের মতে, কোনো একটি ধারণা ক্ষতিকর মনে হওয়ার অজুহাতে তরুণদের বাকস্বাধীনতা খর্ব করা যায় না। কেবল এই কোম্পানিগুলোই নয়, ‘ইলেকট্রনিক ফ্রন্টিয়ার ফাউন্ডেশন’-এর মতো ডিজিটাল অধিকার রক্ষা সংগঠনগুলোও এই আইনটিকে প্রাইভেসি ও বাকস্বাধীনতার জন্য এক ‘দুঃস্বপ্ন’ বলে অভিহিত করেছে। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে। এর আগে মেটা প্রাইভেসি লঙ্ঘনের অভিযোগে ১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার জরিমানা দিতে এবং কিশোরদের ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণে সম্মত হয়েছিল।




