আজ ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। ১৯৬২ সালের এই দিনে তৎকালীন শরিফ শিক্ষা কমিশনের প্রতিবাদ থেকে যে শিক্ষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার মূল লক্ষ্য ছিল সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা। ৬৪ বছর পরেও সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; বরং শিক্ষায় বৈষম্যের নানা মাত্রা যুক্ত হয়েছে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শিক্ষানীতির প্রতিবাদে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েকজন ছাত্র। এরপর থেকে দিনটি শিক্ষক ও ছাত্রসংগঠনগুলো শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
সর্বশেষ জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পঞ্চম থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে শিক্ষানীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ধারণা করা হয়েছিল, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক শিক্ষা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারবে এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের পথ প্রশস্ত হবে। কিন্তু বাস্তবে প্রাথমিক স্তরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ থাকলেও শেখার ঘাটতি পূরণে অনেককে কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাটি কার্যত হোঁচট খাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে প্রথম শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। এরপর বিভিন্ন সরকারের সময়ে আটটি শিক্ষা কমিশন বা কমিটি গঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষানীতি করবে নাকি অন্য কিছু করবে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এরই মধ্যে ২০২৮ সাল থেকে শিক্ষাক্রমে ব্যাপক পরিমার্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৭ সালের পাঠ্যবইয়েও বেশ কিছু পরিমার্জনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বই যুক্ত হবে।
প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয়—প্রতিটি স্তরেই আয়, অবস্থান ও সুযোগের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা। কোথাও পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও গবেষণার সুযোগ সীমিত, কোথাও শিক্ষার্থীরা কোচিংনির্ভর। ফলে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে সে কোথায় জন্মেছে, পরিবারের সামর্থ্য কেমন বা কোন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে—এসবের ওপর।
বৈষম্যের শুরু প্রাথমিক স্তর থেকেই। দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারের অধিকাংশ শিশুর শিক্ষার প্রধান ভরসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে টিউশন ফি নেই, কিন্তু শিক্ষকসংকট, শিক্ষার মান ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি সরকারি এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ইউনিট গত জুনে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের দুই হাজারের বেশি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা যায়, অনেক শিশু বাংলা বর্ণ সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না, ইংরেজি ও গণিতেও রয়েছে দুর্বলতা। অন্যদিকে সচ্ছল পরিবারের শিশুরা কিন্ডারগার্টেন, ইংরেজি মাধ্যম কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তৈরি হচ্ছে দুই ধরনের বাস্তবতা।
পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা কাগজে-কলমে অবৈতনিক হলেও এ সুবিধা কার্যত সরকারি বিদ্যালয়েই সীমিত। কিন্ডারগার্টেনে টিউশন ফি কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই উচ্চ আয়ের পরিবারের সন্তান। এর বাইরে কওমি মাদ্রাসায় বিপুলসংখ্যক শিশু পড়ে। এর সঙ্গে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ঝরে পড়ার হার। বর্তমানে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ১৬ শতাংশের বেশি, যা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঝরে পড়া কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এবং শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:২৮ হলেও এর আড়ালে রয়েছে বড় বৈষম্য। শহরের তুলনায় চর, হাওর, পাহাড় ও দুর্গম এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট বেশি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের অনুমোদিত পদের মধ্যে ৩৬ হাজার ২৩৫টি এখনো শূন্য। অবশ্য এসব পদে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে কাজ করতে হবে। আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অগ্রগতি জানানো যাবে। নিয়োগবিধি অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের পদের ৮০ শতাংশ সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে এবং ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ হয়। ফলে একসঙ্গে অনেক সহকারী শিক্ষকের পদোন্নতি হলে নতুন সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকার হাজারীবাগ এলাকার এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, শিক্ষার মান উন্নত করতে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আবার চালু হয়েছে। শিক্ষাবিদদের বড় অংশের মতে, এতে শিক্ষার সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে প্রতিযোগিতা ও বৈষম্য বাড়তে পারে। তাঁদের যুক্তি, বৃত্তির জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীর ওপর বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়, ফলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে পড়তে পারে। একই প্রশ্ন রয়েছে অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা নিয়েও। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য প্রকট। শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ে সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো ও শিক্ষার মানে বিস্তর পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য মানে জাতির ভিত্তি দুর্বল করা, এটি রোধ করা জরুরি।
মাধ্যমিক স্তরে এসে বৈষম্য আরও স্পষ্ট। এ স্তরের ৭৮ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে মাত্র ৬ শতাংশ। অধিকাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে শিক্ষক, অবকাঠামো ও শিক্ষার মানে রয়েছে ব্যাপক তারতম্য। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্রমতে, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ১৫ হাজার ২৯৩টি পদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শূন্য এবং প্রধান শিক্ষকের ৩৮৩টি পদ খালি। সবচেয়ে বেশি সংকট বিজ্ঞান, গণিত ও আইসিটি বিষয়ে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকসংকট ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব—দুই সংকট মিলেই মাধ্যমিক শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এখন মাধ্যমিকে যথেষ্ট নয়। পরীক্ষায় ভালো ফল করতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে কোচিং বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তৈরি হয়েছে ব্যয়নির্ভর একটি সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থা। পুরান ঢাকার এক শিক্ষার্থীর পরিবারের মাসে দুটি গৃহশিক্ষকের পেছনে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। সচ্ছল পরিবার যেখানে এই ব্যয় বহন করতে পারে, নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি বাদে ওপরের সব শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়া হবে এবং লটারি পদ্ধতি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এতে শিশুদের ওপর চাপ বাড়বে এবং ভর্তি-কোচিংয়ের প্রবণতা নতুন করে বাড়তে পারে।
উচ্চশিক্ষায়ও বৈষম্য প্রকট। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে দেশে ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দুটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর পেছনে বছরে ব্যয় ২ লাখ ৫২ হাজার ২৪১ টাকা, অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজে শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয় মাত্র ৭৮৯ টাকা। দেশের উচ্চশিক্ষার ৭০.২০ শতাংশ শিক্ষার্থীই পড়ছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলোয়। অধিকাংশ কলেজেই পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি ও গবেষণার পরিবেশ সীমিত। অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি অর্থসহায়তা পায় না, পরিচালন ব্যয় মেটাতে তাদের প্রায় পুরোপুরি টিউশন ফির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে উচ্চশিক্ষার ব্যয় সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যায়।
শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নীতিনির্ধারণ, অর্থায়ন, শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে অসম অগ্রাধিকারের ফলে আজকের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকট দূর করা, প্রাথমিক স্তরে মৌলিক শেখার দক্ষতা নিশ্চিত করা এবং গবেষণা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। নতুন সরকার আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে, যা জিডিপির ২ শতাংশ। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং বৈষম্য কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে বলেও মত দেন শিক্ষাবিদরা। ৬৪ বছর আগের সেই আকাঙ্ক্ষা—সবার জন্য গণমুখী ও বৈষম্যহীন শিক্ষা—শুধু শিক্ষায় প্রবেশের সুযোগ বাড়িয়ে পূরণ হবে না। শিক্ষার্থীর জন্ম কোথায়, পরিবারের আয় কত কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছে—এসবের বাইরে গিয়ে সমমানের শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণই থেকে যাবে।




