চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার হলদিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত গর্জনীয়া রহমানিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসায় এক ভিন্ন আঙ্গিকে আরবি ভাষা শেখাচ্ছেন প্রভাষক মাওলানা মুনির আহমেদ। গত ১৫ অক্টোবর তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি শিক্ষার্থীদের কেবল পুঁথিগত বিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে 'কমিউনিকেটিভ' পদ্ধতিতে আরবি কথা বলা শেখান। শ্রেণিকক্ষে সাদা বোর্ডে বিমানবন্দরের মতো বাস্তব পরিস্থিতির সংলাপ লিখে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে তা অনুশীলন করান তিনি। তাঁর লক্ষ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যে জীবিকা, ব্যবসা কিংবা পড়াশোনার জন্য যাওয়া বাংলাদেশিরা যেন ভাষার অভাবেই প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন না হন।

তবে মুনির আহমেদের শিক্ষাদান পদ্ধতি কেবল ভাষাশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পবিত্র কোরআন, হাদিস এবং ইসলামি মনীষীদের জীবনদর্শন থেকে শিক্ষার্থীদের সততা, পরোপকারিতা এবং সুদ-ঘুষের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে থাকার শিক্ষা দেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, শিক্ষার্থীরা যদি বাস্তব জীবনে এসব নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করতে পারে, তবেই একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি প্রকৃত তৃপ্তি পাবেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষা প্রসঙ্গে তিনি জানান, চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা গ্রামের পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পরিবারের আগ্রহে তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে নিজের ইচ্ছাতেই শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ২০০৪ সালে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করার পাশাপাশি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তৎকালীন সময়ে ফাজিল-কামিল ডিগ্রির সমমান স্বীকৃতি না থাকায় তাঁকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আলাদা করে উচ্চশিক্ষা নিতে হয়েছিল। ২০১৬ সালে এনটিআরসিএ-র নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কক্সবাজার ও বোয়ালখালীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা অর্জন করে ২০১৯ সালে বর্তমান মাদ্রাসায় যোগ দেন তিনি।

মাদ্রাসার দৈনন্দিন রুটিন এবং পড়াশোনার বিষয়ে জানান, তিনি নবম শ্রেণি থেকে ফাজিল পর্যায় পর্যন্ত পবিত্র কোরআন-হাদিস, আরবি সাহিত্য, আকাইদ ও ফিকহ পড়ান। আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও তিনি মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। একইসাথে মাদ্রাসাশিক্ষাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করার কথা বলেন তিনি। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, গণিত, ইংরেজি এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করা বর্তমান সময়ের দাবি।

পারিবারিক জীবনে মুনির আহমেদের স্ত্রী ও দুই মেয়ে চট্টগ্রাম শহরে থাকেন। সাপ্তাহিক ছুটিতে তিনি পরিবারের কাছে যান। বড় মেয়ে বর্তমানে একটি মহিলা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। সন্তানদের জন্য তাঁর বিশেষ চাওয়া হলো, তারা যেন হাফেজে কোরআন হওয়ার পাশাপাশি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। সন্তানদের পেশা নিয়ে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই; চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়ার চেয়ে তারা যেন একজন 'ভালো মানুষ' হতে পারে, সেটাই তাঁর মূল চাওয়া।