বিজ্ঞান ও গবেষণার ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে যেখানে জটিল সমস্যার সমাধান এসেছে স্বপ্নের হাত ধরে। আলবার্ট আইনস্টাইন, গণিতবিদ রামানুজন কিংবা লেখক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বদের তালিকায় স্থান পান বিখ্যাত জার্মান রসায়নবিদ ফ্রেডরিখ অগাস্ট কেকুলে। তাঁর একটি স্বপ্ন রসায়ন শাস্ত্রের অন্যতম রহস্যময় যৌগ 'বেনজিন'-এর গঠন বুঝতে সাহায্য করেছিল।
বেনজিনের ইতিহাস শুরু হয় ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপের এক প্রকার গুল্মজাতীয় গাছের ছাল থেকে, যাকে আরবিতে বলা হতো 'লুবান জায়ি'। ইউরোপের সুগন্ধি ও ওষুধ শিল্পে এই উপাদানের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় এবং কালক্রমে এর নাম হয়ে দাঁড়ায় 'গাম বেনজিন' বা সংক্ষেপে 'বেনজিন'। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে প্রথম রাসায়নিকভাবে এই যৌগটিকে আলাদা করতে সক্ষম হন এবং এর নাম দেন 'বাইকার্বোরেট অব হাইড্রোজেন'। পরবর্তীতে ১৮৭৩ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ইলহার্ড মিটসচারলিচ এই যৌগটিকে তরল ও মিষ্টি গন্ধযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে একে 'বেনজিন' নামে অভিহিত করেন। শিল্পবিপ্লবের সময় রংশিল্প এবং আফটার শেভ লোশনে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি ১৯৩৪ সালে লুডভিগ রোজেলাস নামক এক ব্যবসায়ী বিষাক্ত জেনেও এটি কফিতে ব্যবহার করেছিলেন। বর্তমানে প্লাস্টিক, কৃত্রিম রাবার এবং বিভিন্ন ওষুধের মধ্যবর্তী যৌগ হিসেবে বেনজিনের গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৯৭ সালে বিজ্ঞানীরা মহাকাশেও এই যৌগের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন।
১৯ শতকের বিজ্ঞানীদের কাছে বেনজিনের গঠন ছিল এক বড় ধাঁধা। গবেষণায় জানা গিয়েছিল যে, বেনজিনে ছয়টি কার্বন এবং ছয়টি হাইড্রোজেন পরমাণু থাকে (রাসায়নিক সংকেত C6H6)। কিন্তু কার্বন যেহেতু চারযোজী (টেট্রাভ্যালেন্ট), তাই এর গঠনগত বিন্যাস নিয়ে রসায়নবিদরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। এই সংকটময় সময়েই কেকুলে তাঁর উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োগ করেন। ১৮৯৫ সালে বেনজিন রিং আবিষ্কারের ২৫ বছর পর তিনি জানান, কীভাবে তিনি এই সমাধানে পৌঁছেছিলেন।
কেকুলের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৮৬৫ সালে এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখেন দুটি পরমাণু নাচতে নাচতে একে অপরের সাথে যুক্ত হচ্ছে। ঘুম ভাঙার পর তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে খাতা-কলমে তার স্কেচ আঁকেন, যদিও তখন পূর্ণ সমাধান মেলেনি। এরপর একদিন বই পড়তে পড়তে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় তিনি আরও একটি স্পষ্ট স্বপ্ন দেখেন। সেখানে তিনি পরমাণুগুলোকে সর্পিলাকারে ঘুরতে দেখলেন এবং শেষ পর্যন্ত পরমাণুগুলো এমনভাবে যুক্ত হলো যেন একটি সাপ তার নিজের লেজ গিলে ফেলেছে। এই অদ্ভুত দৃশ্যটিই তাঁকে বেনজিনের 'সাইক্লিক' বা চাক্রিক গঠনের ধারণা দেয়।
এই স্বপ্নের পর কেকুলে অনুধাবন করেন যে, বেনজিনের ছয়টি কার্বন পরমাণু একটি রিং বা বলয় তৈরি করে, যা মূলত একটি ষড়ভুজ বা হেক্সাগন আকৃতির। এই রিংয়ের প্রতিটি কার্বনের সাথে একটি করে হাইড্রোজেন পরমাণু যুক্ত থাকে। একক ও দ্বিবন্ধনের সমবণ্টন এবং ইলেকট্রনের ডিলোকালাইজড প্রকৃতির কারণে বেনজিন অণুটি অত্যন্ত স্থিতিশীল হয়। শুধু কার্বন ও হাইড্রোজেন দিয়ে গঠিত হওয়ায় একে হাইড্রোকার্বনও বলা হয়। কেকুলের এই আবিষ্কার জৈব রসায়নের গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।




