ট্রেনে জানালার পাশে বসে থাকা অবস্থায় যদি উল্টো দিক থেকে আরেকটি ট্রেন ছুটে আসে, তখন মনে হয় সেটি প্রচণ্ড গতিতে যাচ্ছে। অথচ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে সেই ট্রেনের গতি স্বাভাবিকই দেখায়। একই গতির ট্রেন, কিন্তু দুই পর্যবেক্ষকের চোখে ভিন্ন গতি — এটা আমরা আপেক্ষিক বেগের সূত্র দিয়ে সহজেই বুঝি। তবে আড়াই হাজার বছর আগে প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক জেনো এ নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, গতি বলতে কিছুই নেই; এটা আমাদের চোখের ভুল মাত্র।

জেনো তাঁর দাবি প্রমাণের জন্য বেশ কিছু প্যারাডক্স সাজিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি বিখ্যাত ধাঁধা হলো স্টেডিয়াম প্যারাডক্স, যা মুভিং রো প্যারাডক্স নামেও পরিচিত। অ্যারিস্টটলের মাধ্যমে এই ধাঁধাটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে। ধাঁধাটি বোঝার জন্য তিনটি ট্রেনের কথা কল্পনা করা যাক — A, B এবং C। প্রতিটি ট্রেনে একটি ইঞ্জিন ও দুটি বগি আছে। A ট্রেনটি স্থির থাকে, আর B ট্রেন পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এবং C ট্রেন পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে একই গতিতে চলতে শুরু করে। এক সেকেন্ড পর B ট্রেনটি A-র সাপেক্ষে এক বগি দূরত্ব অতিক্রম করে, কিন্তু C-র সাপেক্ষে দুই বগি দূরত্ব পেরিয়ে যায়। জেনো প্রশ্ন তোলেন — একই সময়ে একই ট্রেন কীভাবে দুই রকম দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে? যদি গতি সমান থাকে, তাহলে দ্বিগুণ দূরত্ব যেতে দ্বিগুণ সময় লাগার কথা। এখানে তো এক সেকেন্ডেই দুই ঘটনা ঘটে গেল! এর মানে কি সময়ের মধ্যে দুই ধরনের গতি বিদ্যমান?

উত্তরটি কিন্তু সহজ। জেনো এখানে আপেক্ষিক বেগের ধারণাটি উপেক্ষা করেছেন। যখন দুটি বস্তু বিপরীত দিকে চলে, তখন তাদের আপেক্ষিক বেগ যোগ হয়। C ট্রেনটি যেহেতু B-র বিপরীত দিকে ছুটছে, তাই C-র যাত্রীদের কাছে B-র গতি দ্বিগুণ মনে হয়। ফলে এক সেকেন্ডে B, A-র তুলনায় এক বগি আর C-র তুলনায় দুই বগি পার হওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আপেক্ষিক বেগের এই নিয়ম মেনেই ঘটনা ঘটে। জেনো হয়তো ইচ্ছা করেই গতির বিভ্রম নিয়ে দার্শনিক বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে এটি কোনো প্যারাডক্সই নয় — বরং আপেক্ষিকতার এক চমৎকার উদাহরণ।