চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের মিঠার দোকান এলাকার নাথপাড়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় কেফায়েত উল্লাহ কবির আহমদ উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ঈশা রানী দাশ (১২) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে। বিদ্যালয়ের টিফিনের বিরতিতে মহাসড়ক পেরিয়ে শিঙাড়া কিনতে দোকানে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামমুখী স্টার লাইন পরিবহনের একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে নগরের একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে রাতে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
ঈশার বাবা সুনীল কান্তি দাশ (৫২) দীর্ঘদিন ওমানে প্রবাসী ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন স্ট্রোক করায় তার একটি পা পুরোপুরি অসাড় হয়ে যায় এবং অন্য পায়েও শক্তি থাকে না। ফলে গত বছর দেশে ফিরে আসার পর থেকে চলাচলে অক্ষম হয়ে সারা দিন ঘরেই কাটাতে হয় তাকে। প্রতিদিন সকালে দুই মেয়ে বিদ্যালয়ে রওনা দিলে বারান্দায় বসে হাত নেড়ে বিদায় জানাতেন তিনি। গত রোববার সকালেও একইভাবে মেয়েদের বিদায় দেন, কিন্তু বিকেলে তার ছোট মেয়ে আর জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারেনি।
মেয়ের মৃত্যুর খবরে শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন সুনীল ও তার স্ত্রী উষা রানী দাশ। ঘরের উঠানে বসে মেয়ের জন্য আহাজারি করতে করতে উষা বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময়, আবার ফিরে এসে মেয়েটা প্রথমে আমাকে জড়িয়ে ধরত। আমার হাতের বানানো নাশতা খেয়েই স্কুলের জন্য বিদায় নিয়েছিল সে। তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। দুপুরে এলাকার একজন ফেসবুকে ঈশার রক্তাক্ত ছবি দিয়ে দুর্ঘটনার কথা লেখেন। খবর পেয়ে আমি ছুটে গেছি। অ্যাম্বুলেন্সে মেয়েকে নিয়ে নগরের হাসপাতালে ছুটে যাই। আশা ছিল, মেয়েটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। আমার মেয়েটি আর ফিরল না।’ মায়ের কান্না দেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল ঈশার বড় বোন আদিত্যা রানী দাশ (১৬), যে একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুই বোন একসঙ্গে স্কুলে যেত এবং ফিরতও একসঙ্গে।
ঈশার চাচা স্বপন কান্তি দাশ স্থানীয় ঠাকুরদিঘি পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তিনি জানান, অসুস্থ হয়ে প্রবাস থেকে দেশে ফেরার পর সুনীলের পরিবারে অভাব–অনটন দেখা দেয়। তবু দুই মেয়ের পড়াশোনায় যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেই চেষ্টা করে আসছিলেন তিনি। মেয়েরা পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই আশা ছিল তার। এর মধ্যে একটি মেয়েকে এভাবে দুর্ঘটনায় হারাতে হলো।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিকুর রহমান জানান, দুপুরের বিরতির সময় ঈশা স্কুল থেকে বের হয়। এ সময় চট্টগ্রামমুখী একটি বাস তাকে ধাক্কা দেয়। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে নগরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে তার মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, বাড়ি থেকে টিফিন নিয়েই বিদ্যালয়ে গিয়েছিল ঈশা। সেই খাবার না খেয়ে শিঙাড়া কিনতে বের হয়েছিল, কারণ শিঙাড়া তার খুব পছন্দ ছিল।
ঈশার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। দুর্ঘটনার প্রতিবাদে তাঁরা প্রায় আড়াই ঘণ্টা চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক অবরোধ করেন। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বাসটিও ভাঙচুর করা হয়।




