মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান ড্রোন হামলার জেরে সাশ্রয়ী মূল্যের প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) নিজেদের প্রথম উৎপাদন কারখানা চালু করেছে ফ্লোরিডাভিত্তিক স্টার্টআপ পাওয়ারাস। এই কারখানায় শ্রমিকেরা দৈনিক ১২ ঘণ্টা কাজ করে ত্রিমাত্রিক প্রিন্টারে তৈরি যন্ত্রাংশ দিয়ে এমন ড্রোন তৈরি করছেন, যা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০০ মাইল গতিতে ছুটে গিয়ে ইরানের ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম। গত মাস থেকে কারখানাটিতে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

পাওয়ারাসের লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা ড্রোন সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা। কোম্পানির মুখপাত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, বর্তমানে তাদের বিভিন্ন কারখানায় প্রতি মাসে প্রায় তিন হাজার প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরি হচ্ছে। আগামী ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নাগাদ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কারখানা নেটওয়ার্ক স্থাপন করে মাসিক উৎপাদন ১৫ হাজারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ইউএইতে অবস্থিত কারখানাটির ঠিকাদার বা গ্রাহক কারা, তা প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিরক্ষা শিল্পের ধীরগতি ও উচ্চ ব্যয়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পাওয়ারাস আলাদা পথে হাঁটছে। মিত্র দেশগুলোর জরুরি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা স্থাপন না করে, প্রয়োজনীয় অঞ্চলেই স্থানীয় নির্মাতাদের সঙ্গে অংশীদারত্বে দ্রুত ড্রোন তৈরি করছে তারা। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউএইসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের ভূখণ্ডে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইউএই-এর বেসামরিক অবকাঠামো, যেখানে ইরান এ পর্যন্ত ৫০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ২ হাজার ২০০টির বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এতে অন্তত ১৫ জন নিহত এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন; একটি তেল শোধনাগার বন্ধের পাশাপাশি অ্যামাজনের দুটি তথ্যকেন্দ্রও ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রের মজুত কমে আসায় বিকল্প এই ড্রোনের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

পাওয়ারাসের তৈরি প্রতিরক্ষা ড্রোনগুলোর মধ্যে ‘গার্ডিয়ান’ সবচেয়ে পরিচিত, যার দাম প্রায় পাঁচ হাজার ডলার। রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাফল্য পাওয়া ইউক্রেনের একটি নকশার ভিত্তিতে তৈরি এই ড্রোনটি সহজে সংযোজনের জন্য এর যন্ত্রাংশগুলোকে লেগোর মতো জোড়া লাগানোর উপযোগী করা হয়েছে। এতে বাজারে সহজলভ্য ছোট চিপ ও বৈশ্বিক অবস্থান নির্ণয়ের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গার্ডিয়ান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় সক্ষম নয়; সেসব ঠেকাতে লকহিড মার্টিনের পিএসি-৩-এর মতো উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন। ইরানের হামলায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শাহেদ ড্রোন ঠেকাতেই মূলত এই ড্রোন কার্যকর।

পাওয়ারাসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বিপণন বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল সিনেনস্কি জানান, ইউএইয়ের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের একটি গ্রাহকের জন্য দ্রুত ড্রোন সংযোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারখানার কর্মীদের বেশিরভাগ ফিলিপাইন ও চীনের নাগরিক, যারা দৈনিক প্রায় ৩০টি ড্রোন তৈরি করছেন; শিগগিরই এই সংখ্যা ১০০তে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো সুরক্ষায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলারের একটি বাণিজ্যচুক্তিও করেছে পাওয়ারাস। ভারতের মুম্বাইয়ের কাছে একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তারা কাজ শুরু করেছে।

প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কৌশলেও পরিবর্তন আসছে। ট্রাম্প প্রশাসনের চাপে লকহিড মার্টিনের মতো কোম্পানিও এখন যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন এবং সহজ নকশার অস্ত্র তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে। গত জুলাইয়ে তারা ইউরোপে অংশীদারদের সঙ্গে কম খরচের প্রতিরক্ষা ড্রোন তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার দাম পিএসি-৩-এর প্রায় অর্ধেক। তবে নতুন অস্ত্রটির পরীক্ষা ২০২৮ সালের আগে সম্ভব হবে না।

প্রতিযোগিতার বাজারেও রয়েছে পাওয়ারাস। গত অক্টোবরে রেথিয়ন ইউএইতে তাদের ‘কায়োট’ ড্রোন তৈরির ঘোষণা দিয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ ডলার। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার নেরোস প্রতিষ্ঠান ‘ব্যান্ডিট’ নামে প্রায় পাঁচ হাজার ডলার দামের ড্রোন তৈরি করছে। সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টেসি পেটিজন মনে করেন, গার্ডিয়ান ও পিএসি-৩ একে অপরের বিকল্প নয়, বরং পরিপূরক। ইরান সম্ভবত রাশিয়ার তৈরি জেরান-৩-এর মতো দ্রুতগতির ড্রোন সংগ্রহ করছে, যা আগের সংস্করণের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় রাশিয়ার ইউক্রেনে ব্যবহৃত ব্যাপক ড্রোন হামলার কৌশল বিবেচনায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।