কক্সবাজারের টেকনাফে ২২ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা সৈয়দ আমিনের জীবন এখন পানির হিসাবের সাথে বাঁধা। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এই ব্যক্তি সাত সদস্যের পরিবারের প্রধান। বর্ষাকালে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ লিটার পানি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে তা কমে ৫ থেকে ১৫ লিটারে নেমে আসে। এই সামান্য পানি দিয়েই তাদের পানীয়, রান্না, গোসল এবং শৌচকর্ম সারতে হয়। অনেক সময় গোসলের সুযোগটুকুও তারা পান না। একই সংকটে আছেন ২৮ বছর বয়সী খালেদা ও তার পরিবার। তাদের মতো প্রায় ২৫ হাজার রোহিঙ্গা এই ক্যাম্পের পানির জন্য সম্পূর্ণভাবে পার্শ্ববর্তী একটি খালের ওপর নির্ভরশীল।

এই এলাকায় ভূ-প্রকৃতি পাথুরে হওয়ার কারণে গভীর নলকূপ বসানো অত্যন্ত জটিল, যা পুরো টেকনাফ অঞ্চলকেই পানির সংকটে ফেলেছে। নব্বইয়ের দশক থেকে এখানে কিছু রোহিঙ্গা বসতি থাকলেও ২০১৭ সালে লাখ লাখ মানুষের আগমনে বিদ্যমান অগভীর নলকূপ ও খালের পানির ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানে ২০১৯ সালে ইউনিসেফের অর্থায়নে এবং অক্সফ্যামের উদ্যোগে একটি সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়, যা বর্তমানে ডিএসকে (দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র) পরিচালনা করছে। তবে শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, টেকনাফে পানির সংকট অত্যন্ত প্রকট। শীতকালে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে জনপ্রতি পানি রেশনিং করে মাত্র ৫ লিটার দেওয়া হয়।

পানির এই সংকট কেবল রোহিঙ্গাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি করেছে। ২০১৭ সালের পর হাজার হাজার টিউবওয়েল বসানোর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে, যার ফলে স্থানীয় কৃষকরা শীতকালে সেচের পানি পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নের কানজর পাড়ার স্থানীয়দের জন্য অক্সফ্যামের সৌরবিদ্যুৎ চালিত পাম্পের মাধ্যমে স্বস্তি এসেছে। আগে গ্রামের নারীদের দেড়-দুই কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনতে হতো, যেখানে তারা প্রায়ই হয়রানির শিকার হতেন। পানির তীব্র কষ্ট ছিল এতটাই যে, ওই গ্রামে মেয়ে বিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হতো। এখন পাইপলাইনের মাধ্যমে তারা পানির চাহিদা মেটাচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) টেকনাফে একটি বিশাল সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের প্রকল্প নিয়েছে, যা চালু হতে আরও দুই-তিন বছর সময় লাগতে পারে। এটি হবে দেশের অন্যতম বৃহত্তম গৃহস্থালী পানি সরবরাহ প্রকল্প।

পানির পরিশোধন প্রক্রিয়া সম্পর্কে ডিএসকে-ইউনিসেফ ওয়াশ প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল করিম জানান, খালের ঘোলা পানি প্রথমে প্রাইমারি সেডিমেন্টশন ট্যাংকে তিন ঘণ্টা রাখা হয় এবং ফিটকারি ব্যবহার করে পরিষ্কার করা হয়। এরপর সেকেন্ডারি ট্যাংকে ক্লোরিন দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে চারটি বিতরণ ট্যাংকে নেওয়া হয়। প্রতিটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৯৫ হাজার লিটার। শুকনো মৌসুমে যখন কাছের খাল শুকিয়ে যায়, তখন পাঁচ কিলোমিটার দূরের মির্জা ছড়া থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি আনা হয়। ওয়াশ সেক্টরের নিয়ম অনুযায়ী জনপ্রতি ন্যূনতম ১০ লিটার পানি নিশ্চিত করতে হয়, তবে চরম খরায় ১৫ লিটারে নেমে এলেও তা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়। পানি অপচয় রোধে তারা এখন ব্যাকওয়াশ গ্রে ওয়াটার প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পানি থেকে পুনরায় পানযোগ্য পানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। বর্তমানে ১০৭টি ট্যাপস্ট্যান্ডের মাধ্যমে ২৫ হাজার রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় ৭০০ জন এই সুবিধা পাচ্ছেন।