শিশুরা যখন বড় হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক ধরনের তাড়না তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়ায় তারা প্রায়ই মা-বাবার সাহায্য বা মতামত চায়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই পরামর্শ পাওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যান করে। অনেক অভিভাবকই এই আচরণে বিভ্রান্ত হন এবং মনে করেন, সন্তান যদি নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে চায়, তবে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়ার প্রয়োজন কী।

প্রকৃতপক্ষে, পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে শিশুরা তাদের নিজেদের চাওয়াকে আরও স্পষ্টভাবে চিনতে শেখে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো পোশাক বা ভ্রমণের জায়গা নির্বাচনের সময় মা-বাবার প্রস্তাব শুনে তারা বুঝতে পারে যে, ওই নির্দিষ্ট বিষয়টি তাদের পছন্দ নয়, বরং তারা অন্য কিছু চায়। অর্থাৎ, অনেক সময় তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়ার জন্য নয়, বরং নিজেদের পছন্দের সাথে মিলিয়ে দেখার জন্য মা-বাবার মতামত জানতে চায়।

এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা কেবল মানসিক আশ্বাস খোঁজে। কোনো বিষয়ে দ্বিধায় থাকলে তারা জানতে চায় মা-বাবা কী ভাবছেন, যাতে নিজের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তারা আরও নিশ্চিত হতে পারে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিভাবকদের উচিত সিদ্ধান্তটি সন্তানের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া। বরং জিজ্ঞেস করা যেতে পারে যে, তারা কি চান মা-বাবা তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিন, নাকি শুধু পছন্দটি জানবেন।

পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করার বিপরীতে অভিভাবকরা যদি বিরক্ত হয়ে কথা বলেন বা জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন, তবে তা মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে একটি সংঘাতের রূপ নিতে পারে। এর ফলে সন্তান মনে করতে পারে যে, সাহায্য চাইলে সে তার স্বাধীনতা হারাবে, যা ভবিষ্যতে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে এবং সন্তান সাহায্য চাইতে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মা-বাবার জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো:

প্রথমত, সন্তান ঠিক কী ধরনের সাহায্য চাইছে তা শুরুতেই স্পষ্ট করে নেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করতে অনেক বিকল্প না দিয়ে মাত্র দুই থেকে তিনটি পছন্দ তাদের সামনে রাখা ভালো। তৃতীয়ত, মতের ভিন্নতাকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং তর্কের বদলে তাদের পছন্দের কারণ জানতে হবে। চতুর্থত, নিরাপত্তা বা পারিবারিক নিয়মের বিষয় থাকলে কেন নির্দিষ্ট কিছু বিকল্পের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়, তা বুঝিয়ে বলা উচিত।

তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, সন্তান যদি প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে চরম দ্বিধায় থাকে, তবে বুঝতে হবে সে হয়তো ভুল করার ভয় পায় কিংবা মা-বাবাকে হতাশ করতে চায় না। দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো বিষয়ে সন্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করলে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় তারা কেবল চায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে মা-বাবা পাশে থাকুক। এই মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য বুঝতে পারলে পারিবারিক বিরোধ কমে এবং সন্তানের ব্যক্তিত্বের সঠিক বিকাশ ঘটে।