বর্তমান কর্মসংস্কৃতিতে 'কুইয়েট কুইটিং' বা 'লাউড কুইটিং'-এর বিপরীতে এখন নতুন একটি প্রবণতা দেখা দিয়েছে, যাকে বলা হচ্ছে 'লাউড ওয়ার্কিং'। এই পদ্ধতিতে কর্মীরা তাদের কাজের ন্যূনতম দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে নিজেদের সাফল্য এবং অর্জনগুলো সবার সামনে ব্যাপকভাবে জাহির করার চেষ্টা করেন। উদাহরণস্বরূপ, ছোট ছোট সাফল্যগুলো লিঙ্কডইন-এ পোস্ট করা কিংবা কাজ শেষ হওয়া মাত্রই স্ল্যাক (Slack)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে পুরো টিমকে জানিয়ে দেওয়া এই প্রবণতার অংশ।
ফিন্যান্স প্ল্যাটফর্ম 'টাইড' (Tide)-এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের একজন গড়কর্মী বছরে প্রায় ১৩১ ঘণ্টা—অর্থাৎ ১৭টি কর্মদিবসের সমান সময়—নিজেদের কাজের দৃশ্যমানতা বাড়াতে ব্যয় করেন। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের প্রশংসা করা, মিটিংয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা এবং টিম অ্যাপে আপডেট দেওয়ার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ প্রজন্মের মধ্যে, যাদের প্রায় ৭০ শতাংশ 'লাউড ওয়ার্কিং'-এ বিশ্বাসী এবং সপ্তাহে গড়ে প্রায় ৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন আত্মপ্রচারে।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, এই কৌশলের ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। দেখা গেছে, যারা নিজেদের কাজের কথা উচ্চকণ্ঠে প্রচার করেন, তাদের ৭৭ শতাংশ গত এক বছরে নতুন ক্লায়েন্ট পাওয়া, বেতন বৃদ্ধি বা পদোন্নতির মতো সুযোগ পেয়েছেন। এমনকি ১৫ শতাংশ কর্মী এই কারণে বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন। এছাড়া ১৭ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, নিজেদের সাফল্যের প্রচারের কারণে অন্য প্রতিষ্ঠানের নজর কেড়েছেন এবং নতুন চাকরি পেয়েছেন। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে প্রচারের আলোই পুরস্কার বা সুযোগ পাওয়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে এই প্রবণতা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। সহকর্মীদের মধ্যে এটি চরম বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৭ শতাংশ কর্মী এই 'পারফরম্যাটিভ' বা প্রদর্শনীমূলক সংস্কৃতির কারণে চাকরি ছাড়ার কথা ভেবেছেন এবং প্রতি ১০ জনের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই এই কারণে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দিয়েছেন। মজার বিষয় হলো, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীরা যেমন এই ট্রেন্ডের সাথে যুক্ত, তেমনি এর বিরূপ প্রভাবে চাকরি ছাড়ার কথা ভাবছে এই বয়সের প্রায় অর্ধেক কর্মী। এর মধ্যে ২০ শতাংশ ইতিমধ্যেই পদত্যাগ করেছেন।
বিশেষ করে আইটি, টেলিকম এবং ফিন্যান্স খাতের কর্মীরা এই ধরনের প্রদর্শনমুখী সংস্কৃতির প্রতি সবচেয়ে বেশি অসহিষ্ণু। এছাড়া নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই কারণে চাকরি ছাড়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
টাইড-এর ইউকে এবং ইউরোপের সিইও জর্জ শ্মিড্ট এই বিষয়ে বলেন, ছোটখাটো সাফল্যকে বড় ঘোষণা হিসেবে উপস্থাপন করা সহকর্মীদের কাছে বিরক্তিকর হতে পারে। তবে তিনি মনে করেন, আত্মপ্রচার এবং নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস রাখার মধ্যে পার্থক্য আছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা বা যারা ফ্রিল্যান্সিং করতে চান, তাদের জন্য নিজেদের দক্ষতা ও সাফল্যের প্রচার করা সবচেয়ে কার্যকর মার্কেটিং কৌশল হতে পারে। তা সত্ত্বেও, অধিকাংশ কর্মী এমন প্রতিষ্ঠান পছন্দ করেন যেখানে কেবল চিৎকার করে প্রচারের বদলে প্রকৃত কঠোর পরিশ্রমকে পুরস্কৃত করা হয়।




