রাজধানীর মিরপুর-১৩ নম্বরের পার্বত্য বৌদ্ধ সংঘ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী পঞ্চম ‘আদিবাসী খাদ্য ও শস্য মেলা’। নাগরিক উদ্যোগ এবং ‘আদিবাসী সুহৃদদের’ যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এই মেলায় পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্যদ্রব্য, শস্য ও নানা পণ্যের সমাহার ঘটেছে। শুক্রবার সকালে অতিথিদের উপস্থিতিতে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। আগামী শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য এই মেলাটি উন্মুক্ত থাকবে।

মেলা প্রাঙ্গণে মণিপুরি, গারো এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পণ্য প্রদর্শিত হচ্ছে। বিশেষ করে রাখাইন সম্প্রদায়ের স্টলে সাদা ও কালো বিন্নি চালের তৈরি বিভিন্ন পিঠার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মুণ্ডিও পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া পাহাড়ের জনপ্রিয় কলাপাতায় রান্না করা হেবাঙ, ঐতিহ্যবাহী পাজন, কাপ্তাই লেকের মাছ এবং জুমে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি ও ফলমূলের পসরা বসেছে। মেলার শুরুতে ভিড়ের কারণে অনেক জনপ্রিয় পণ্য দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। অনেক ক্রেতা বাজারজাত পণ্যের তুলনায় পাহাড়ের জুমচাষিদের উৎপাদিত পণ্যকে অধিক নিরাপদ মনে করে এখানে কেনাকাটা করতে এসেছেন।

মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাঙামাটি পার্বত্য জেলার সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্য বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং দেশের বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তুলতে এই ধরনের মেলার ভূমিকা অনস্বীকার্য। তিনি আরও বলেন, জুমচাষে রাসায়নিক উপাদান ছাড়াই নিরাপদ ফসল উৎপাদন করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। এই পণ্যগুলোর সঠিক বাজারজাতকরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা প্রয়োজন বলে তিনি জানান এবং এ বিষয়ে কথা বলার প্রতিশ্রুতি দেন। এছাড়া বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বা ‘রেইনবো নেশন’ গড়ার লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে মানবাধিকারকর্মী শিরীন পারভীন হক এবং অধিকারকর্মী মেইনথিন প্রমীলা তাদের বক্তব্যে পাহাড়ের নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার প্রশংসা করেন। তবে তাঁরাই উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, পাহাড়ের মানুষের ভূমির অধিকার এখনো স্বীকৃত নয় এবং প্রতিনিয়ত ভূমি দখলের কারণে তারা উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। তাঁদের মতে, আদিবাসীদের খাদ্য উৎপাদন পদ্ধতি সংরক্ষণ করতে হলে ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন তাঁর বক্তব্যে আদিবাসীদের ঐতিহ্য তুলে ধরার গুরুত্ব ব্যক্ত করেন এবং রাজধানীতে তাঁদের পণ্যের জন্য একটি স্থায়ী ও আলাদা বাজার তৈরির দাবি জানান।

মেলার প্রথম দিন সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে পাহাড়ি শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন। আগামীকালের সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলাদেশ আইডল মং উ চিং মারমা, বর্ষা চাকমা, বুলু তঞ্চঙ্গ্যা এবং গারো শিল্পী মার্কুস চিসিম গান পরিবেশন করবেন। এছাড়া পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ প্রদর্শিত হবে।