চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই সঞ্চয়পত্রের বাজারে দেখা গেছে অভাবনীয় উত্থান। জুলাই মাসেই নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকায়, যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো ১২ মাসের নিট বিক্রির প্রায় চার গুণ। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, একক মাস হিসেবে গত চার বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ নিট বিক্রির রেকর্ড। এর আগে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ৫২৩ কোটি টাকার নিট বিক্রি হয়েছিল, তবে তার পরবর্তী মাসগুলোতে এই ধারা আর অব্যাহত থাকেনি। এমনকি সাম্প্রতিক অনেক মাসেই নিট বিক্রির পরিমাণ ঋণাত্মক ছিল।
উল্লেখ্য, নিট বিক্রি বলতে বোঝায় পুরনো সঞ্চয়পত্রের সুদ ও আসল পরিশোধের পর সরকারি কোষাগারে যে পরিমাণ অর্থ জমা থাকে। সরকার এই অর্থ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে। গত বছরের জুলাই মাসে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৯৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। অন্যদিকে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৪০ কোটি ২০ লাখ টাকা। এর আগের তিনটি অর্থবছরে নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল, যার অর্থ হলো সঞ্চয়পত্র বিক্রির চেয়ে সুদ-আসল পরিশোধের খরচ বেশি ছিল। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ৩১ জুলাই পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বাবদ সরকারের মোট ঋণ স্থিতি ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকায় পৌঁছেছে, যা জুন শেষে ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
সঞ্চয়পত্রের প্রতি এই আকস্মিক আগ্রহের কারণ ব্যাখ্যা করে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, ব্যাংক খাতের বর্তমান অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি শেয়ারবাজারে চলমান মন্দার প্রভাব রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের সঞ্চয় হ্রাস পেলেও, যারা সঞ্চয় করছেন তারা অধিক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন। তার মতে, সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকি নেই, অর্থ হারানোর ভয় নেই এবং প্রয়োজন হলে তা ভাঙানো যায়; পাশাপাশি মুনাফার হারও এখনো সন্তোষজনক।
বাজেটের ঘাটতি পূরণে সরকার সাধারণত ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও পরবর্তীতে বিএনপি সরকার সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা করে। ওই অর্থবছরে মোট ৯২ হাজার ৬১৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হলেও সুদ-আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৯২ হাজার ৭৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যার মধ্যে মুনাফার অংশ ছিল ৪৭ হাজার ৫১০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও হ্রাস করে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার।




