ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি পথ বেছে নেওয়া হয়—অন্য প্রতিষ্ঠান কেনা, নতুন কিছু তৈরি করা অথবা অংশীদারিত্ব করা। তবে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) নতুন কিছু তৈরির ক্ষেত্রে দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার খরচ কমেছে এবং পণ্য তৈরির চক্র দ্রুততর হয়েছে, যার ফলে এআই-ভিত্তিক ব্যবসাগুলো শুরু থেকেই আধুনিক নকশায় গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে নতুন উদ্যোগগুলোর প্রসারের গতি অনেক বেড়ে গেছে। আগের তুলনায় এখন গড়ে ৩১ মাসেই একটি সফল উদ্যোগ ১০ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করছে, যেখানে আগে এই সময় লাগত ৩৮ মাস। এমনকি এখন আগের চেয়ে ৪০ শতাংশ কম পুঁজিতেই এই উদ্যোগগুলো লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে।
তবে এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কোনো উদ্যোগ যত বেশি সফল হয়, তাকে রক্ষা করা তত কঠিন হয়ে পড়ে। মূল ব্যবসার শাসন ব্যবস্থা, দলগত গঠন, প্রচলিত প্রক্রিয়া এবং নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিগুলো অনেক সময় নতুন উদ্যোগের প্রসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সিইও-দের উচিত সঠিক সময়ে হস্তক্ষেপ করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া যে তারা কোথায় বিনিয়োগ করবেন এবং কতদূর যাবেন। একটি শক্তিশালী আইডিয়া সাধারণত ক্রমবর্ধমান বাজার, গ্রাহকের সমস্যা এবং কোম্পানির বিশেষ দক্ষতার সমন্বয়ে তৈরি হয়। এক্ষেত্রে সিইও-দের ভাবতে হবে নতুন এই উদ্যোগটি মূল ব্যবসার কতটা কাছাকাছি থাকবে এবং এটি কি বর্তমানের প্রধান আয়ের উৎসের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে নাকি বাড়তি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, হানিওয়েল (Honeywell) তাদের শিল্প অভিজ্ঞতাকে সফটওয়্যার রাজস্বতে রূপান্তর করতে 'হানিওয়েল কানেক্টেড এন্টারপ্রাইজ' তৈরি করেছে, যা ২০২৩ সাল নাগাদ ১.৫ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক বিক্রিতে পৌঁছেছে এবং মূল কোম্পানির তুলনায় তিনগুণ দ্রুত বাড়ছে।
সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও অনিবার্য। তাই সিইও-দের উচিত দলগুলোকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও শেখার সুযোগ দেওয়া, তবে অকার্যকর উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ অব্যাহত না রাখা। এআই-এর কল্যাণে এখন কম খরচে অনেকগুলো ছোট ছোট উদ্যোগ বা 'বেট' নেওয়া সম্ভব। যেসব উদ্যোগ প্রকৃত গতি দেখাচ্ছে, সেখানে পুঁজি ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করা অধিক কার্যকর। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একসঙ্গে তিনটি বা তার বেশি উদ্যোগ গ্রহণ করেন (পোর্টফোলিও পদ্ধতি), তারা একক উদ্যোগের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন। সৌদি টেলিকম কোম্পানি গ্রুপ এই পদ্ধতির মাধ্যমে পেমেন্ট, ইন্টারনেট অফ থিংস, সাইবার সিকিউরিটি এবং ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল উদ্যোগ গড়ে তুলেছে, যা তাদের মূল ব্যবসার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ গুণ দ্রুত বাড়ছে।
অনেক সময় প্রজেক্ট রিপোর্ট দেখে নেতৃত্ব বিভ্রান্ত হন, অথচ প্রকৃত প্রমাণ থাকে গ্রাহক এবং বাণিজ্যিক তথ্যে। গ্রাহকরা পণ্যটি ব্যবহার করছেন কি না, তারা পুনরায় ফিরে আসছেন কি না বা অর্থ দিতে ইচ্ছুক কি না—এগুলোই আসল সংকেত। ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের মতো সিইও-দের উচিত স্বল্পমেয়াদী পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রমাণ যাচাই করা এবং অকার্যকর প্রকল্প বন্ধ করে সফল সুযোগগুলোতে পুঁজি সরিয়ে নেওয়া।
কর্পোরেট কাঠামোর ভেতরে নতুন উদ্যোগ শুরু করার কিছু সুবিধা থাকে, যেমন—তৈরি করা ব্র্যান্ড, পুঁজি, ডেটা এবং গ্রাহকভিত্তি। তবে মূল কোম্পানির সীমাবদ্ধতা যেন এই নতুন উদ্যোগের ওপর চেপে না বসে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বিসিপি (BCP) যখন মোবাইল ওয়ালেট 'Yape' চালু করে, তারা প্রথাগত ব্যাংকারদের বদলে পণ্য উন্নয়ন ও ডিজাইনের দক্ষ লোক নিয়োগ করেছিল। এর ফলে তারা মূল কোম্পানির শক্তি ব্যবহার করেও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পেরেছে এবং বর্তমানে ১৮ মিলিয়নেরও বেশি ব্যবহারকারী তাদের সাথে যুক্ত। তবে উদ্যোগটি সফল হওয়ার সাথে সাথে অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য অংশ এবং কঠোর শাসন ব্যবস্থা সেখানে ঢুকে পড়ে, যা প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। এই সময়েই সিইও-র ভূমিকা হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। যেসব সিইও ব্যক্তিগতভাবে নতুন উদ্যোগ তৈরির বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন, তাদের নতুন ব্যবসাগুলো পাঁচ বছরের মধ্যে মোট রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে। সিইও-র সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে তথ্যের সাথে যুক্ত থেকে সঠিক সময়ে হস্তক্ষেপ করাই প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি।




