জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। তবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কারখানায় শীতলীকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে তা উৎপাদক ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ড—উভয় পক্ষের জন্যই আর্থিকভাবে লাভজনক হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ছাদ তাপ নিরোধক করা, প্রতিফলক রঙের ব্যবহার এবং উন্নত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থার মতো বিনিয়োগগুলো বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর এবং মাত্র চার বছরের মধ্যেই এই ব্যয়ের টাকা উঠে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা রয়টার্সকে দেওয়া তথ্যে এই দাবি জানান। গবেষকরা এই বিনিয়োগের একটি নির্দিষ্ট মডেলও প্রস্তাব করেছেন, যেখানে পুরো আর্থিক বোঝা কেবল সরবরাহকারীদের ওপর না চাপিয়ে পণ্যের মূল্যের মাধ্যমে ব্র্যান্ডগুলোও এর একাংশ বহন করবে।
ঢাকার আটটি পোশাক কারখানায় দীর্ঘ ছয় মাস তাপমাত্রা পরিমাপ করে দেখা গেছে, কারখানার অভ্যন্তরে তাপমাত্রা অনেক সময় বাইরের চেয়েও বেশি থাকে। বিশেষ করে ফিনিশিং ও ইস্তিরি বিভাগের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি গরমের মুখে পড়েন। এই অতিরিক্ত তাপের কারণে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর বার্ষিক আয়ের প্রায় ৪.১ শতাংশ ক্ষতি হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে তাপপ্রবাহ কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং অর্থনৈতিক ঝুঁকির কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ পূর্ণকালীন কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রায় ৭ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে, যদিও সেই সময়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আরও ২৮ কোটি বৃদ্ধি পাবে। ফলে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জেসন জাড জানান, ক্রেতা ও সরবরাহকারী উভয় পক্ষই এখন বুঝতে পারবে যে এই সংকট মোকাবিলায় ঠিক কতটুকু বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, গত এক বছরে অনেক পোশাক ব্র্যান্ড এই বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে এবং তারা জানতে চেয়েছে কত সময়ের মধ্যে এই ব্যয়ের অর্থ পুনরায় অর্জিত হবে। এর পাশাপাশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস নিয়েও উৎপাদনকারীদের সাথে আলোচনা শুরু করেছে ব্র্যান্ডগুলো।
তিন বছর আগের এক গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছিল যে, বন্যা ও অতিরিক্ত গরমের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান ও কম্বোডিয়ার পোশাক রপ্তানি আয় থেকে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে। এই বাস্তবতাকে এখন ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শুরু করেছে পোশাক শিল্প। তবে ব্র্যান্ডগুলো প্রকৃতপক্ষে কতটা অর্থ ব্যয় করবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। এদিকে, আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (এএএফএ) সম্প্রতি শ্রমিক সুরক্ষায় এক নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এককভাবে কোনো কারখানার পক্ষে এই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে, তাই ব্র্যান্ডগুলোর উচিত এই ব্যয়ের একটি অংশ বহন করা। এএএফএ-র নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নেট হারম্যান বলেছেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা এখন এক নতুন বাস্তবতা, তাই সরবরাহ ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শ্রমিকদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।




