ফেয়ারারির প্রথম ইলেকট্রিক গাড়ি 'লুচে' (Luce) উন্মোচনের পর থেকেই নানা ধরনের উপহাসের শিকার হয়েছিল। গত ২৫ মে যখন গাড়িটি সামনে আনা হয়, তখন অনেক ভক্ত একে 'চাকার ওপর ম্যাজিক মাউস', এমনকি ডিশওয়াশার বা মাইক্রোওয়েভের সাথে তুলনা করেন। কেউ কেউ একে এপ্রিল ফুল জোক হিসেবেও দেখেছিলেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কোম্পানির সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং চেয়ারম্যানের মতে, এই গাড়ির নকশার কারণে ফেরারি তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের ঝুঁকি নিচ্ছে এবং তিনি এর থেকে কোম্পানির বিখ্যাত 'প্রান্সিং হর্স' লোগোটি সরিয়ে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তবে এই সব নেতিবাচক সমালোচনা দামী গাড়ির ক্রেতাদের প্রভাবিত করতে পারেনি। ৫ লক্ষ ৬০ হাজার ৮০০ ডলার প্রারম্ভিক মূল্যের এই ইলেকট্রিক কারটির জন্য ২০২৭ সালে যতগুলো ইউনিট তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার সবকটির জন্য ইতিমধ্যেই ক্রেতা পাওয়া গেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ক্রেতারা গাড়িটি একবার টেস্ট ড্রাইভ করার সুযোগ পাওয়ার আগেই এটি কেনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছেন। ফেরারির সিইও বেনেডিত্তো ভিগনা গত মঙ্গলবার তৃতীয় প্রান্তিকের আয়ের খসড়া আলোচনায় জানান, ২০২৭ সালের ডেলিভারির জন্য বরাদ্দ সব গাড়ি এরই মধ্যে বুকড হয়ে গেছে। এখন নতুন কেউ কিনতে চাইলে তাকে অন্তত এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। ভিগনা নির্দিষ্ট করে বলেননি মোট কতটি ইউনিট বিক্রি হয়েছে, তবে তিনি জানান যে আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়া-পাসিফিকের বিভিন্ন স্থানে ৫০টিরও বেশি প্রাইভেট ভিউয়িং এবং প্রিমিয়ার আয়োজন করা হয়েছিল, যা ডিজিটাল অভিজ্ঞতার চেয়ে গাড়ির বিশেষত্ব ফুটিয়ে তুলতে বেশি সাহায্য করেছে।
লুচে-র শুরুর দিনগুলো ছিল বেশ কঠিন। এর অস্বাভাবিক নকশা—যেমন বড় চাকা, গোলাকার বডি এবং চারটি দরজা—বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছিল, যার ফলে ফেরারির শেয়ারের দাম ৮ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। মর্নিংস্টার-এর ইক্যুইটি অ্যানালিস্ট রেল্লা সাসকিন উল্লেখ করেছিলেন যে, ফেরারির ব্র্যান্ড ভ্যালু তার নকশার অনন্যতার ওপর নির্ভরশীল, কিন্তু এই গাড়ির বাহ্যিক রূপ বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে।
তবে সিইও বেনেডিত্তো ভিগনা এই সাহসী পদক্ষেপের পক্ষে কথা বলেছেন। অ্যাপলের সাবেক ডিজাইন প্রধান জনি আইভের প্রতিষ্ঠান 'লাভফ্রম' (LoveFrom)-এর সাথে কাজ করে এই গাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। ভিগনার মতে, এই গাড়িটি সবার পছন্দ নাও হতে পারে, তবে এটি মূলত একটি ফেরারি গাড়ি যা ইলেকট্রিক শক্তিতে চলে, কেবল একটি 'ইলেকট্রিক কার' নয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যারা এই গাড়িটি সত্যিই পছন্দ করেন না, তাদের কাছে তারা এটি বিক্রি করবেন না।
লুচে-র মাধ্যমে ফেরারি এমন এক সময়ে ঝুঁকি নিচ্ছে যখন ল্যাম্বরগিনি এবং পোরশে-র মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করছে। ল্যাম্বরগিনি ২০২৮ সালে তাদের প্রথম পূর্ণ ইলেকট্রিক কার আনার পরিকল্পনা বাতিল করেছে এবং পোরশে তাদের 'টাইকান' মডেলের উৎপাদন ২০৩০ সালের মধ্যে বন্ধ করার কথা ভাবছে। এর বিপরীতে, ইতালীয় শব্দ 'আলো' থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি 'লুচে'র মাধ্যমে ফেরারি তাদের ভবিষ্যতের পথ আলোকিত করতে চায়।
এই উদ্ভাবনের পাশাপাশি ফেরারির মূল ব্যবসা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি ১.৯ বিলিয়ন ইউরো রাজস্ব অর্জন করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ বেশি। এছাড়া তাদের অপারেটিং প্রফিট দাঁড়িয়েছে ৫৬৩ মিলিয়ন ইউরো। সিএফও আন্তোনিও পিকা পিকন জানান, গাড়ির কাস্টমাইজেশনের মাধ্যমে তারা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আয় করেছেন, যা মোট রাজস্বের ২১ শতাংশেরও বেশি অবদান রেখেছে।




