সাধারণত কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর মানুষের মনে ক্ষোভ তৈরি করলেও, জনপ্রিয় ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম ক্যানভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তটি ইন্টারনেটে প্রশংসার ঝড় তুলেছে। প্রতিষ্ঠানের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মেলানি পারকিন্স মঙ্গলবার ঘোষণা করেন যে, কোম্পানির সামগ্রিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে ১,২৭১ জন কর্মী প্রভাবিত হবেন, যা তাদের মোট জনবলের প্রায় ২২ শতাংশ। এই ঘোষণাটি তিনি কর্মীদের জানান এবং পরবর্তীতে লিঙ্কডইন প্রোফাইলে শেয়ার করেন, যা এখন কর্মী ছাঁটাই ব্যবস্থাপনার একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ক্যানভার এই পদক্ষেপের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তাদের অত্যন্ত উদার 'এক্সিট প্যাকেজ'। বিদায়ী কর্মীদের জন্য ন্যূনতম ছয় মাসের বেতন নিশ্চিত করা হয়েছে, যার সাথে বিধিবদ্ধ সুযোগ-সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া, যেসব দেশে ক্যানভা স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে, সেখানে চলে যাওয়া কর্মীরা আরও ১২ মাস স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা পাবেন। পেশাগত উত্তরণের জন্য তাদের এক-টু-ওয়ান কোচিং, ইন্টারভিউ প্রস্তুতি এবং এক বছরের লিঙ্কডইন প্রিমিয়াম সদস্যপদ দেওয়া হবে। এমনকি কর্মীরা তাদের ব্যবহৃত কোম্পানির ম্যাকবুকগুলো সাথে নিয়ে যেতে পারবেন। এছাড়া যারা গত এক বছরের মধ্যে কোম্পানিতে যোগ দিয়েছেন, তাদের জন্য এক বছরের ভেস্টিং ক্লিফ-এর নিয়মটি তুলে দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ উদ্যোগ হলো 'ক্যানভা কালেক্টিভ ফান্ড'। এই তহবিলের আওতায় যোগ্য প্রাক্তন কর্মীরা নিজস্ব কোনো আইডিয়া বাস্তবায়ন, ব্যবসা শুরু বা নতুন প্রজেক্টের জন্য ১০,০০০ ডলারের অনুদান পেতে পারেন। ক্যানভা এই সৃজনশীল কাজের কোনো মালিকানা বা ইক্যুইটি দাবি করবে না। ইতোমধ্যে বই প্রকাশ থেকে শুরু করে টেকসই খামার তৈরির মতো বিভিন্ন প্রস্তাব জমা পড়েছে, যার আবেদনের শেষ তারিখ ১৪ ডিসেম্বর।

এই পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে মেলানি পারকিন্স জানান, গত এক দশকে প্রথমবারের মতো এই বছর কোম্পানির প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। ২০২৬ সালের রাজস্ব প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানটি বড় হওয়ার সাথে সাথে কাজের ধরন অনেক বেশি বিশেষায়িত হয়ে গিয়েছিল, ফলে মালিকানার খণ্ডন ঘটেছিল। এখন লক্ষ্য হলো ছোট এবং ক্ষমতাপ্রাপ্ত দলের মাধ্যমে কাজ করা, যাতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়। যদিও ফরচুন ম্যাগাজিন মনে করে এটি এআই-চালিত একটি পুনর্বিন্যাস, তবে ক্যানভার মুখপাত্র স্পষ্ট করেছেন যে, এই পদগুলো এআই দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে না, বরং এআই-এর যুগে নতুন ধরণের পণ্য তৈরির জন্য দক্ষ দলের সমন্বয় করা হচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে তুলনা করলে ক্যানভার এই উদারতা স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রযুক্তি খাতের গড় বিদায়ী প্যাকেজ ছিল মাত্র ১১.২ সপ্তাহের বেতন। বিপরীতে ক্যানভার ন্যূনতম ২৬ সপ্তাহের বেতন এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এই গড়ের দ্বিগুণ। এমনকি ওরাকলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্যাকেজের সমান সুবিধা দিচ্ছে ক্যানভা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোম্পানিগুলো এখন বিদায়ী কর্মীদের প্রতি সদয় হওয়ার গুরুত্ব বুঝতে পারছে। কারণ এটি কেবল চলে যাওয়া কর্মীদের নয়, বরং যারা থেকে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতে যারা যোগ দেবেন, তাদের কাছে কোম্পানির ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করে। বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে কর্মী ছাঁটাই সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন ক্যানভার এই সহানুভূতিশীল ও স্বচ্ছ পদ্ধতিটি একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হয়ে রইল।