সম্প্রতি এক রাজনৈতিক বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি শিক্ষিত বেকার যুবক রয়েছেন। তাঁর এই দাবি সরকারি পরিসংখ্যান দ্বারা যাচাইকৃত নয়, তবে এটি দেশের কর্মসংস্থান সংকটের দিকে নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বক্তব্যটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেওয়া হলেও এর পেছনে যে বাস্তবতা রয়েছে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংখ্যাটি যদি অর্ধেক বা তারও কমেও ধরা হয়, তবুও লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী রয়েছেন যাঁদের দিনের একটি বড় অংশের কোনো নিয়মিত অর্থকরী ব্যবহার নেই। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল জনগোষ্ঠীর সময় কি কেবল নষ্ট হচ্ছে? সময় এমন একটি সম্পদ যা সংরক্ষণ করা যায় না। আজকের আট ঘণ্টা আগামীকালের জন্য জমিয়ে রাখা অসম্ভব। একজন কর্মক্ষম মানুষ যদি প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজ করতে পারেন, কিন্তু কাজ না পান, তাহলে শুধু তাঁর আয়ই হারায় না, হারিয়ে যায় তাঁর জীবনের একটি অমূল্য অংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, বেকারত্বের সবচেয়ে নিষ্ঠুর দিকটি হলো আয় না থাকা নয়, বরং একটি অস্বাভাবিক জীবনকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক মনে হতে শুরু করা। যুবসমাজের একটি বড় অংশ ‘চাকরির প্রস্তুতি’কেই যেন পূর্ণকালীন পেশা বানিয়ে ফেলেছে। কোচিং সেন্টারের সিঁড়ি, ফটোকপির দোকানে সিভির স্তূপ, চাকরির পরীক্ষার প্রবেশপত্র, সাধারণ জ্ঞান থেকে গণিতের মোটা বই—সব মিলিয়ে একেকজন তরুণ বছরের পর বছর শুধু প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তব কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।

অর্থনীতির ভাষায় শুধু ‘কাজ’ দিলেই হয় না, প্রয়োজন ‘অর্থকরী কাজ’। কোনো কাজ তখনই অর্থকরী হয়, যখন তার জন্য কেউ অর্থ দিতে রাজি হন। একজন শিক্ষক পড়ান, কারণ তাঁর পড়ানোর মূল্য আছে; একজন দরজি জামা তৈরি করেন, কারণ কেউ সেই জামা কিনবেন; একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী কোড লেখেন, কারণ কোনো প্রতিষ্ঠান সেই কোডের জন্য টাকা দেয়। অর্থাৎ প্রতিটি চাকরির পেছনে একজন ক্রেতার প্রয়োজন হয়। সেই ক্রেতা পাশের মহল্লার মানুষ হতে পারেন, কোনো প্রতিষ্ঠান, সরকার, কিংবা পৃথিবীর অন্য প্রান্তের অচেনা কেউ। কিন্তু কাউকে না কাউকে বলতে হবে—‘হ্যাঁ, এই পণ্যটি আমার দরকার, এই সেবাটির দাম আমি দেব।’

দেশের বাজারে যদি যথেষ্ট অর্থকরী কাজ না থাকে, তাহলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেই কয়েকটি দরজার সামনে ভিড় করবে যেগুলো অন্তত খোলা বলে মনে হয়। এখানেই মূল রহস্য। তরুণটি চাকরি চায়, তার মা-বাবাও চান, ব্যবসায়ীও নতুন লোক নিয়োগ দিতে চান, সরকার কর্মসংস্থান বাড়াতে চায়, বিরোধী দলও চায়—এই বিষয়ে প্রায় সর্বসম্মতি আছে। তাহলে বাধাটা কোথায়? চাকরি কি কোনো গুদামের পণ্য? না, চাকরি আসলে অনেক কিছুর শেষ ফল। কোথাও আগে একটি পণ্য বিক্রি হয়েছে, একটি সেবার ক্রেতা পাওয়া গেছে, একটি কারখানা অর্ডার পেয়েছে, একটি ব্যবসা তার বাজার বাড়িয়েছে—তারপর সেই টাকার পথ ধরে কোনো এক সকালে একজন মানুষের হাতে এসেছে নিয়োগপত্র।

বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি তাই কয়েক কোটি নিয়োগপত্রের প্রশ্ন নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কয়েক কোটি মানুষের শ্রম দিয়ে আমরা এমন কী তৈরি করতে পারি, যা কিনতে কেউ রাজি হবে? এই ‘কেউ’ পাশের বাড়ির মানুষটি হতে পারেন, বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান, অথবা দশ হাজার কিলোমিটার দূরের এমন একজন ক্রেতা যিনি বাংলাদেশকে কখনো দেখেননি। তিনি নিজের প্রয়োজন মেটাতে বাজারে আসেন, আমাদের সমস্যা সমাধানে নয়। পৃথিবীর বাজারে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি ‘আমাদের কত মানুষের কাজ দরকার?’ তা নয়; বাজারের প্রশ্নটি অনেক শীতল—‘আপনারা কী দিতে পারেন?’ সম্ভবত বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের আসল গল্প শুরু হয় ঠিক এই প্রশ্নটির পর থেকেই।