উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরে জেলা শাসকের কার্যালয়ের সংলগ্ন একটি ১৫০ বছরের প্রাচীন মসজিদ গত শনিবার ভোরে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারি জমিতে মসজিদটি নির্মিত হয়েছে উল্লেখ করে নিম্ন আদালতের নির্দেশে জেলা প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। একই সঙ্গে সরকারি জমি দখলের অভিযোগে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানা করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালে, যখন স্থানীয় বজরং দলের এক নেতা সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে মামলা দায়ের করেন। গত ১৬ জুলাই ম্যাজিস্ট্রেট নির্মাণটি বেআইনি ঘোষণা করে এবং জরিমানা ধার্য করেন। এর বিরুদ্ধে মসজিদ কর্তৃপক্ষ জেলা জজ আদালতে আপিল করে, কিন্তু সেটিও খারিজ হয়ে যায়। ২ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত রায়ের পরই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। পরদিন শুক্রবার রাতে বুলডোজার প্রস্তুত করা হয় এবং শনিবার ভোর থেকে ভাঙার কাজ শুরু হয়। এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সমাজবাদী পার্টির সাংসদ ইকরা হোসেন ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এত দ্রুততার সঙ্গে আগে কোনো মসজিদ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর। কাশী, মথুরা, সম্ভল, ভোজশালাসহ বিভিন্ন মসজিদ নিয়ে এখনো মামলা চলছে। কলকাতা বিমানবন্দরের প্রাচীন মসজিদ স্থানান্তর নিয়েও বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু সাহারানপুরে মসজিদ কর্তৃপক্ষকে উচ্চতর আদালতে যাওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি, যা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হায়দরাবাদের এআইএমআইএম নেতা আসাউদ্দিন ওয়েইসি বলেছেন, এর উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, আগামী বছরের শুরুতেই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা ধরে রাখতে চান। তাঁর শাসনামলে ব্রাহ্মণসমাজ ক্ষুব্ধ বলে অভিযোগ রয়েছে। অযোধ্যার রামকোষে চুরির ঘটনায় হিন্দু সমাজেও অস্বস্তি আছে। নিটসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় দুর্নীতি ও প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে আন্দোলন চলছে। এদিকে রাহুল গান্ধীর 'ছাত্রো কি গুঞ্জ' কর্মসূচি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, যা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেসও ক্রমশ একে অপরের কাছাকাছি আসছে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য বিজেপি নতুন করে উগ্র হিন্দুত্ববাদে উসকানি দিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু সাহারানপুরই নয়, বিভিন্ন রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো বেপরোয়া আচরণ করছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার' স্লোগান অর্থহীন। তাদের নতুন স্লোগান হলো 'ধর্ম যার যার, উৎসবও তার তার'। সংগঠনটি দুর্গাপূজার মণ্ডপে আমিষ খাবারের স্টল নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। মহারাষ্ট্রে নবরাত্রির গরবা ও ডান্ডিয়া অনুষ্ঠানে মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কপালে তিলক না থাকলে বা আধার কার্ড দেখাতে না পারলে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে। রামনবমীর আসরও মুসলমানমুক্ত করার চেষ্টা চলছে। রামলীলায় অহিন্দু অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অংশগ্রহণ বন্ধের জন্য নতুন ফরমান জারি করা হচ্ছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরে এক নাবালিকা ছাত্রীর বাবাকে মারধরের ঘটনায় স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক যুবক নিজেই দায় স্বীকার করে বলেছে, সে ওই ব্যক্তিকে খুন করতে চেয়েছিল। বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, লোকজন শক্তি পার্টির চিরাগ পাসোয়ান এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে 'বড় ভাই' বলে সে দাবি করে যে কেউ তাকে ছুঁতে পারবে না। প্রকাশ্যে অপরাধ স্বীকার করেও পুলিশ তাকে ধরেনি, পরে চাপের মুখে এফআইআর করে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনা প্রমাণ করে শাসক দলের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে বারবার ভাবতে হয়।
বিজেপি এই প্রবণতার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দলীয়ভাবে কিছু বলেনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষের মুখে বিজেপি মনে করছে কট্টর হিন্দুত্ববাদই তাদের পরিত্রাণের একমাত্র পথ।




