ফ্রান্সের আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশটির ক্রমবর্ধমান জাতীয় ঋণের সমাধান নিয়ে এক চমকপ্রদ ও বিতর্কিত প্রস্তাব দিয়েছেন বামপন্থী প্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশঁ। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ব্যাংক অফ ফ্রান্সের অধীনে থাকা জাতীয় ঋণের অংশবিশেষ অংশ সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হবে। মেলেনশঁর দাবি, ঋণের এই বোঝা কমিয়ে সরকার সামাজিক কর্মসূচিগুলোতে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে। তিনি সহজভাবে এই প্রক্রিয়াটিকে বর্ণনা করে বলেছেন, ব্যাংক অফ ফ্রান্সের কাছে থাকা ১৮ শতাংশ ঋণ কেবল 'আগুনে পুড়িয়ে দিলেই' সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
তবে এই প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন করা মোটেও সহজ নয়। ফ্রান্সের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে, ঋণের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে অত্যন্ত উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। বিশেষ করে চলতি বছরে বন্ড মার্কেটের মাধ্যমে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য যখন সরকারের সামনে, তখন এমন পদক্ষেপ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মেলেনশঁ যদিও দাবি করছেন যে তিনি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের ঋণ নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ বাতিলের কথা বলছেন, তবে সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে তিনি ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি)-র সাথে এই বিষয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই পরিকল্পনার তীব্র বিরোধিতা করেছেন জার্মানির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান এবং ইসিবি গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য জোয়াকিম নাগেল। তিনি ফরাসি সংবাদপত্র 'লে মন্ড'-কে জানিয়েছেন যে, ইউরোসিস্টেমের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা ইসিবি জাতীয় ঋণ বাতিল করতে পারে না। ইউরোপীয় চুক্তি অনুযায়ী এটি সরকারের জন্য 'মনিটারি ফিন্যান্সিং' হিসেবে গণ্য হবে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া এমন পদক্ষেপের ফলে চরম মুদ্রাস্ফীতি বা হাইপার-ইনফ্লেশনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ফ্রান্সের পাবলিক ডেট এখন তাদের জিডিপি-র ১১৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১০০ শতাংশের তুলনায় বেশি। ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অর্থনীতিটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিম্ন প্রবৃদ্ধির সাথে লড়াই করছে। বিপরীতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে ফ্রান্সের বাজেট ঘাটতি জিডিপি-র প্রায় ৫ শতাংশ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত ৩ শতাংশের সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ফরাসি ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের মুনাফার হার (yield) জার্মান বন্ডের তুলনায় প্রায় ৮৮ বেসিস পয়েন্ট বেশি, যা ২০১২ সালের ঋণ সংকটের পর সর্বোচ্চ স্তরের কাছাকাছি। এলপিএল ফিন্যান্সিয়ালের ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজি প্রধান ক্রিস্টিয়ান কার সতর্ক করেছেন যে, এই ব্যবধান যদি ৯০ বেসিস পয়েন্ট অতিক্রম করে, তবে বিনিয়োগকারীরা ফ্রান্সের সমস্যাটিকে দীর্ঘমেয়াদী হিসেবে গণ্য করবে। যেহেতু বৈশ্বিক ঋণ বাজারগুলো একে অপরের সাথে যুক্ত, তাই ফ্রান্সের প্রতি আস্থার এই সংকট অন্যান্য দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্তমানে পার্লামেন্টে কোনো একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল না থাকায় বাজেট হ্রাস বা ঘাটতি কমানোর পদক্ষেপ নেওয়া আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।




