আফ্রিকা মহাদেশের প্রকৃত ও বিশাল আয়তন সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে একটি নতুন বিশ্ব মানচিত্রের অনুমোদন দিয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। শুক্রবার অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা মূলত আফ্রিকাভুক্ত দেশসমূহ এবং বিভিন্ন অ্যাডভোকেসি গ্রুপের দীর্ঘদিনের দাবির ফল। টোগোর নেতৃত্বে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর সমর্থনপুষ্ট এই প্রস্তাবটি ১৬৪টি সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র দেশ হিসেবে বিপক্ষে ভোট দেয় এবং সার্বিয়া, এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা ও ইউক্রেনসহ মোট ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে।
এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো ১৬শ শতাব্দী থেকে প্রচলিত 'মার্কেটর প্রজেকশন' (Mercator projection) মানচিত্রের পরিবর্তে 'ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন' (Equal Earth projection) ব্যবহারে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সরকার ও প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা। ভূগোলবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ড এবং আফ্রিকার আয়তন প্রায় সমান দেখায়, যা বাস্তবসম্মত নয়। বিপরীতে, ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনে মহাদেশগুলোর প্রকৃত অনুপাত বজায় রাখা হয়েছে, যেখানে দেখা যায় আফ্রিকা আসলে গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে ১৪ গুণ বড়। তবে জাতিসংঘ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে যে, এই রেজোলিউশন মার্কেটর মানচিত্র নিষিদ্ধ করছে না বা বাধ্যতামূলকভাবে পরিবর্তনের নির্দেশ দিচ্ছে না, বরং নতুন মানচিত্রটি ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করছে।
ভোটগ্রহণের আগে টোগোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ডুসি মন্তব্য করেন যে, মানচিত্র আমাদের বিশ্বের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করে। এটি শিক্ষা প্রদান, কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে। নতুন মানচিত্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া অন্যতম সংস্থা 'আফ্রিকা নো ফিল্টার' এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, তারা এখন স্কুল, পাঠ্যবই, সংবাদ মাধ্যম, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে নির্ভুল মানচিত্র দেখতে চায়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারোট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (পূর্বের টুইটার) লিখেছেন, মানচিত্র পরিবর্তনের মাধ্যমে পৃথিবী পরিবর্তিত না হলেও, ভুল উপস্থাপনাকে সংশোধন করা সত্যের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। ঐতিহাসিকভাবে, ফ্লেমিশ মানচিত্রকার জেরার্ডাস মার্কেটর নৌ-চালকদের সহায়তার জন্য মার্কেটর মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। কিন্তু এতে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি এলাকা যেমন উত্তর আমেরিকা ও গ্রিনল্যান্ডের আয়তন বড় দেখায় এবং আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার আয়তন ছোট হয়ে যায়। ২০১৮ সালে উদ্ভাবিত ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন পৃথিবীর বক্রতা অনুসরণ করে মহাদেশগুলোর প্রকৃত আকার প্রদর্শন করে। সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল অধ্যাপক মার্ক মনমোনিয়ারের মতে, নৌ-চলাচলের নির্দিষ্ট কাজে মার্কেটর মানচিত্র কার্যকর হলেও এছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে এর ব্যবহারের যৌক্তিকতা নেই।




