এআই প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের শেখার ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এক আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রযুক্তি কি মানুষের চিন্তা করার প্রয়োজনীয়তাই কমিয়ে দেবে? লিখতে, অনুবাদ করতে, হিসাব করতে, এমনকি কোড লিখতে সক্ষম এআই এখন মানুষের বহু কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে দিচ্ছে। কিন্তু এতে মানুষের নিজস্ব চিন্তা ও বিচারশক্তি বিকশিত হওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থাকে এ প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। সুইডেনের সাম্প্রতিক পিআইএসএ ২০২৫-এর ফলাফল এ প্রসঙ্গে আলোচনা তৈরি করেছে। ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, সুইডেনের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার গড় স্কোর ২০২২ সালের তুলনায় ২১ পয়েন্ট কমে ৪৬৬-এ নেমেছে। গণিতে ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৬৪ হয়েছে। বিজ্ঞানে স্কোর ৪৮৫, যা ৮ পয়েন্ট কমলেও পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নয়। ওইসিডির গড় স্কোরও পড়া ও গণিতে উল্লেখযোগ্য পতন দেখিয়েছে।
সুইডিশ শিক্ষা কর্তৃপক্ষ স্কোলভারকেটের ২০২৬ সালের প্রতিবেদন বলছে, উচ্চ বিদ্যালয়ের নিম্নস্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ির কাজে এআই ব্যবহারের হার ২০২৪ সালে ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। ১৭-১৮ বছর বয়সীদের অর্ধেকের বেশি জানিয়েছে, তারা স্কুলের কাজে লেখা সংক্ষেপণ বা তৈরি করতে এআই চ্যাটবট ব্যবহার করে। প্রতারণার মতো কাজেও এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছে শিক্ষার্থীরা।
অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সিঙ্গাপুর পিআইএসএ ২০২৫-এ বিজ্ঞান, গণিত ও পড়ায় বিশ্বসেরা কয়েকটির একটি। সেখানে ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী সপ্তাহে অন্তত একবার শেখার জন্য এআই ব্যবহার করে। আর ৮১ শতাংশ শিক্ষার্থী জানিয়েছে, এআইয়ের তৈরি তথ্যের মান যাচাই করতে তাদের শেখানো হয়। সিঙ্গাপুর শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করছে না; বরং এআইয়ের উত্তরকে প্রশ্ন করে দেখার কৌশল শেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ এ পিআইএসএ ২০২৫-এর অংশ নয় বলে সুইডেন বা সিঙ্গাপুরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা সম্ভব নয়। তবে এআই যখন শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ করছে, তখন সেখানে শেখার সংস্কৃতি বনাম পরীক্ষায় ভালো করার সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব প্রকট হতে পারে। আগে গাইডবই যেমন শর্টকাট ছিল, এখন এআই চ্যাটবট নতুন শর্টকাট হয়ে উঠতে পারে। এআই দিয়ে উত্তর তৈরি করে নিজের নামে জমা দেওয়া আগের চেয়ে সহজ হয়ে গেছে। ফলে শেখা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ার ঝুঁকি আছে।
তবে এআই যে বাংলাদেশের জন্য বিশাল সুযোগও বয়ে আনতে পারে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। গ্রামীণ শিক্ষার্থী স্কুলে যা শেখানো হয় না, তা এআইয়ের মাধ্যমে জানতে পারবে। গবেষক, কৃষক, চিকিৎসক বা উদ্যোক্তা—সবাই তথ্যের দ্রুত প্রবেশাধিকার পাবে। ভাষাগত বাধা পেরিয়ে জ্ঞানের জগতে ঢোকার সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে এআইকে চিন্তার বিকল্প নয়, সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুইডেন ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সামনে দুটি ভিন্ন পথ দেখায়। একটি পথে সতর্ক থাকতে হয় প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব থেকে, অন্যটিতে প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা বুঝে সেটিকে শিক্ষার কাজে লাগানো যায়। বাংলাদেশকে অন্ধ অনুকরণ না করে নিজস্ব শিক্ষা সংস্কৃতির সঙ্গে মানানসই পথ খুঁজতে হবে।
এআই যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মানুষের কৌতূহল, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও বিচারবুদ্ধির বিকল্প হতে পারবে না। ভবিষ্যতে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হবে সে কতটা তথ্য জানে, তা দিয়ে নয়; বরং সে কীভাবে প্রশ্ন করে, যাচাই করে এবং সিদ্ধান্ত নেয়—তা দিয়ে। শিক্ষাব্যবস্থাকে তাই এআইয়ের যুগে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বিকাশের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানুষের চিন্তাশক্তিকে ছুটি না দেয়, সেদিকেই লক্ষ রাখতে হবে।




