উগান্ডার ঐতিহাসিক তোরো রাজ্যের নতুন রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হয়েছেন এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা। পেশায় সাংবাদিক এই ব্যক্তি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে গণমাধ্যমে কাজ করার পর এখন রাজমুকুট পরেছেন। তাঁর নতুন রাজকীয় পরিচয় হলো—রাজা প্রথম এডওয়ার্ড রুকিডি কিজানাঙ্গোমা নিয়াবোঙ্গো। তবে তাঁর এই সিংহাসন আরোহণের পথটি ছিল যথেষ্ট জটিল এবং বিতর্কময়।
তোরো রাজ্যের পূর্ববর্তী রাজা চতুর্থ ওয়ে ন্যিম্বা কাবাম্বা ইগুরু রুকিডি গত মাসে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৩৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৯৫ সালে মাত্র তিন বছর বয়সে সিংহাসনে বসার কারণে তিনি 'বালক রাজা' হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে রাজপরিবারে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বাবিতো গোত্রের ২১ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি নতুন রাজা নির্বাচনের দায়িত্ব পায়। এই প্রক্রিয়ায় কিজানাঙ্গোমার পাশাপাশি প্রিন্স জর্জ ডেসমন্ড কামুরাসি নামের একজন অপেশাদার ফুটবলারকেও বিবেচনা করা হয়েছিল, তবে তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শেষ পর্যন্ত কমিটির সিদ্ধান্তে সাংবাদিক কিজানাঙ্গোমা রাজা হিসেবে নির্বাচিত হন।
তবে এই নির্বাচন মেনে নিতে পারেননি প্রয়াত রাজা ওয়ের মা, রানি বেস্ট কেমিগিসা আকিকি। তাঁর দাবি, প্রয়াত রাজা ওয়ে একটি গোপন ইচ্ছাপত্র (উইল) রেখে গেছেন, যেখানে তাঁর এক শিশুপুত্রকে উত্তরাধিকারী করার কথা বলা হয়েছিল। রানি জানান, ওই শিশুটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে অবস্থান করছে। রানি কেমিগিসার মতে, এই নির্বাচন প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক এবং তিনি একে 'দ্বিতীয় একজন রাজাকে ঘোষণা' বলে অভিহিত করেছেন। যদিও রাজকীয় কমিটি এই দাবি নাকচ করে জানিয়েছে যে, তোরোর ঐতিহ্য ও রীতিনীতি মেনেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং ওই শিশুর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
রাজকীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে কিজানাঙ্গোমাকে মধ্যরাত থেকে বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হয়েছে এবং প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটে কারুজিকা রাজপ্রাসাদে পৌঁছাতে হয়েছে। সেখানে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজা ঘোষণা করা হয়। অনুষ্ঠানে উগান্ডার প্রেসিডেন্ট ইয়োওয়েরি মুসেভেনি উপস্থিত ছিলেন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রধান মুহুজি কাইনেরুগাবাও নতুন রাজাকে সমর্থন জানিয়েছেন।
বংশগতভাবে কিজানাঙ্গোমা রাজবংশেরই সদস্য। তিনি প্রয়াত রাজা ওয়ের চাচাতো ভাই এবং ১১তম রাজা রুকিডি তৃতীয়-এর নাতি। এমনকি তাঁর নাম 'কিজানাঙ্গোমা'র অর্থ হলো—'যিনি রাজকীয় ঢাক নিয়ে আসেন', যা তাঁর বর্তমান অবস্থানের সাথে এক অদ্ভুত সংগতি তৈরি করেছে।
১৯৭০ সালে জন্ম নেওয়া কিজানাঙ্গোমা ১৯৯৯ সালে মেকেরেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর উগান্ডা ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (ইউবিসি) এবং প্রতিবেশী দেশ রুয়ান্ডাতে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। রাজা হিসেবে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের সামাজিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতাকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে চান। তিনি ঘোষণা করেছেন যে, রাজপ্রাসাদ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং তাঁর লক্ষ্য হবে ঐক্য ও উন্নয়ন।
উল্লেখ্য, উগান্ডার ঐতিহ্যবাহী রাজাদের বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই, তবে তাঁদের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত প্রবল। ১৯৬৭ সালে বিলুপ্ত হওয়া এই রাজতন্ত্রগুলো ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট মুসেভেনি সরকার পুনরায় ফিরিয়ে আনে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক গর্ব বজায় রাখা।




