ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার তীব্রতা ও পুনরাবৃত্তি পূর্বের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে বাসিন্দারা আগে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম, যেমন 'দুই দেয়ালের নিয়ম' (বাইরের দেয়াল থেকে অন্তত দুটি দেয়ালের দূরত্বে থাকা) মেনে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রুশ বাহিনীর পরিবর্তিত রণকৌশল এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিবিসি ভেরিফাই-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন কিয়েভে প্রতিদিন সবচেয়ে বেশি এয়ার রেইড অ্যালার্ট বা বিমান হামলার সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই মাসের প্রথম ১০ দিনে তিনটি বড় হামলায় কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়, যাতে প্রায় ৬০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেও একই ধরনের ভয়াবহ হামলা অব্যাহত ছিল।
রুশ বাহিনী এখন আগের চেয়ে কম বিমান ব্যবহার করছে, কারণ বিমানের গতিবিধি আগে থেকে শনাক্ত করা সহজ। এর পরিবর্তে তারা ব্যবহার করছে উচ্চগতিসম্পন্ন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, যা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগে খুব সামান্য সময় দেয়। অনেক ক্ষেত্রে সতর্কবার্তার সাথে সাথেই বিস্ফোরণ শুরু হয়ে যাচ্ছে। কিয়েভের বাসিন্দা দারিয়ার মতো অনেকেই এখন নিজেদের ঘরে অনিরাপদ বোধ করছেন। তার মতে, নিকটস্থ শেল্টারে পৌঁছাতে ১০ মিনিট সময় লাগলেও ব্যালিস্টিক হামলার ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা পাওয়ার সময় থাকে মাত্র চার মিনিট বা তারও কম। এই আতঙ্কে তিনি শহর ছেড়ে রোমানকিবের পারিবারিক বাড়িতে চলে গেছেন এবং প্রতিদিন চার ঘণ্টা সময় ব্যয় করে কিয়েভে যাতায়াত করছেন।
শহরের প্রবীণ বাসিন্দাদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ৯৮ বছর বয়সী নাদিয়া সিবিনা এবং তার মেয়ে ওল্হা ভ্লাসভা উচ্চতলার অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। অসুস্থতার কারণে নাদিয়া বিছানা ছেড়ে নড়তে পারেন না, ফলে তারা কোনো আস্তানায় যেতে পারেন না। সতর্কবার্তায় ওল্হা তার মায়ের শরীর কম্বল দিয়ে ঢেকে দেন এবং জানালার ফ্রেমে গদি বসিয়ে দেন, আর নিজে আলমারির ভেতর লুকিয়ে থাকেন। নাদিয়া জানান, মাঝরাতে একের পর এক সতর্কবার্তা এবং বিস্ফোরণের শব্দে মানুষ ঘুমানোর সুযোগ পায় না, ফলে তারা 'জম্বিদের' মতো ক্লান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়।
এই পরিস্থিতি কেবল রাতের বেলা নয়, দিনের বেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সেপ্টেম্বরে স্কুল খোলার পর দিনের বেলাতেও একের পর এক সতর্কবার্তা এবং বিস্ফোরণ ঘটেছে, যার ফলে অনেক শিশু বাড়িতেই অবস্থান করছে এবং অনেকে স্কুল বা কিন্ডারগার্টেনের বেসমেন্টে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে। মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, আগস্টের শেষ দিকে হামলায় দুই শিশু আহত হয়েছে। এছাড়া বিমান হামলার সতর্কতার কারণে শপিং মল বন্ধ হয়ে যায় এবং মেট্রো স্টেশনগুলোর কার্যক্রম স্থগিত থাকে, যা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে।
এদিকে, নাটালিয়া বুশকোভস্কার মতো অনেক অভিভাবক এখন থেকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা (প্ল্যান এ, বি এবং সি) তৈরি করে রাখছেন। তার ৯ ও ১২ বছর বয়সী সন্তানরা প্রাথমিক চিকিৎসার অংশ হিসেবে টর্নিকেট ব্যবহার করা শিখেছে। নাটালিয়া জানান, যুদ্ধের পঞ্চম বছরে এই অবিরাম আক্রমণ সাধারণ মানুষের মানসিক ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এবং শরীর ও মন থেকে পুনরুদ্ধারের সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার মিত্র দেশগুলোর কাছে উন্নত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের অনুরোধ জানিয়েছেন। কিয়েভের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, বিদেশি সহযোগীদের এই দ্বিধা সাধারণ নাগরিকদের জীবনকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ঘটে যাওয়া আরও একটি ব্যালিস্টিক হামলায় ১০ ও ১২ বছর বয়সী দুই শিশুসহ ২০ জন আহত হয়েছেন বলে মেয়র ক্লিচকো নিশ্চিত করেছেন।




