গত দেড় বছর ধরে রাশিয়ার কয়েক কোটি নাগরিককে তাদের মোবাইলে একটি নির্দিষ্ট অ্যাপ ইনস্টল করতে বাধ্য করা হয়েছে। রঙিন আইকনযুক্ত এই বার্তা আদান-প্রদান ও লেনদেনের অ্যাপটির নাম ‘ম্যাক্স’। সম্প্রতি এক ফরেনসিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই অ্যাপটি মূলত ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে নজরদারির একটি ‘গোপন প্রবেশদ্বার’ হিসেবে কাজ করছে, যার মাধ্যমে সরকার ব্যাপক পর্যবেক্ষণ চালাতে পারে।
ম্যাক্স তৈরি করেছে রাশিয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘ভিকোনতাকতে’, যা দেশটির সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এমনকি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পরোক্ষ মালিকানাও রয়েছে বলে জানা গেছে। রুশ কর্তৃপক্ষ এই অ্যাপটিকে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের ‘দেশপ্রেমিক বিকল্প’ হিসেবে প্রচার করেছে। দেশের জনপ্রিয় তারকারা র্যাপ ভিডিও এবং কমেডি শোতে এই অ্যাপের বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, ফলে চলতি গ্রীষ্মেই এটি রাশিয়ার সর্বাধিক ব্যবহৃত বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপে পরিণত হয়েছে।
ম্যাক্স মূলত একটি ‘সুপার অ্যাপ’, যার ভেতরে একাধিক ‘মিনি অ্যাপ’ রয়েছে — ব্যাংকিং সেবা, মেসেজিং, এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা এক প্ল্যাটফর্মেই পাওয়া যায়। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত সুপার অ্যাপ চীনের ‘উইচ্যাট’-এর সাথে এর তুলনা করা যায়। তবে উইচ্যাট যেখানে কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে চীনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের অংশ হয়ে উঠেছে, সেখানে ম্যাক্সকে হঠাৎ করেই এমন এক জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যারা একসময় তুলনামূলক মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার করত।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক রয়া এনসাফির নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ম্যাক্সের নজরদারি ক্ষমতার বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গবেষক দল রাশিয়ায় ব্যবহৃত অ্যাপটির একটি সংস্করণ ডাউনলোড করে পরীক্ষা করে দেখেছে যে, ব্যবহারকারীদের অজান্তেই তাদের ডিভাইসের স্ক্রিনশট নেওয়া এবং মিনি অ্যাপগুলোর তথ্যের ছবি তোলা সম্ভব। এটি মিনি অ্যাপে জমা থাকা সব বার্তা, তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের হিসাবেও প্রবেশ করতে সক্ষম। এমনকি ব্যবহারকারীর পরিচয় ব্যবহার করে অন্য কাউকে বিভ্রান্ত করতেও পারে অ্যাপটি। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মিনি অ্যাপগুলোর ভেতরে ক্ষতিকর কোড প্রবেশের সুযোগ রয়েছে, যা ব্যবহার করে রাশিয়ার সরকার চাইলে সাইবার হামলাও চালাতে পারবে।
রয়া এনসাফি বলেছেন, “আমরা এক দশক ধরে রাশিয়ার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা নিয়ে গবেষণা করছি। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর নজরদারি কৌশলের মধ্যে ম্যাক্স হলো সবচেয়ে চতুর এবং ভীতিকর একটি মাধ্যম।” তিনি উল্লেখ করেছেন, ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় এটি একটি অনুকরণীয় নীলনকশা, যা ইরান, কাজাখস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলো ভবিষ্যতে অনুসরণ করার চেষ্টা করতে পারে। এনসাফির মতে, ব্যবহারকারীদের ফোনে টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করা থাকলে ম্যাক্স সরাসরি সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারে না, তবে রাশিয়া ইতিমধ্যে এই দুটি অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে।
রাশিয়ার সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মরত বহু নাগরিককে কার্যত ম্যাক্স ব্যবহারে বাধ্য করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এমনকি স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এই প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ স্থানান্তরের চাপের মুখে পড়েছেন। মস্কোর এক স্কুলশিক্ষক জানান, গত বছরের মার্চে নগর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্কুলের সব যোগাযোগ — অভিভাবকদের সঙ্গে চ্যাট, হোমওয়ার্ক পাঠানোসহ — ম্যাক্সে স্থানান্তর করা হয়। তিনি বলেন, “এখানে ‘না’ বলার কোনো সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত অ্যাপটি ব্যবহার করতেই হয়।” সেন্ট পিটার্সবার্গের এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী দানিল জানান, শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে তাঁকে ম্যাক্স ডাউনলোড করতে বাধ্য করা হয়, কারণ কিউআর কোড ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবনে প্রবেশই সম্ভব নয়।
তবে রাশিয়ার অভিজাত শ্রেণির মধ্যে এই অ্যাপের ব্যবহার নিছক লোকদেখানো বলে মনে করছেন কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। ক্রেমলিনের ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি ও তাঁর বন্ধুরা ম্যাক্স ব্যবহারের জন্য আলাদা ফোন কিনেছেন, কিন্তু মূল ফোনে টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মতো পছন্দের অ্যাপগুলোই ব্যবহার করেন। “এসবই লোকদেখানো। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেউ সত্যি সত্যি এটা ব্যবহার করে না,” বলেন তিনি।
খবরের প্রধান উৎস হিসেবে টেলিগ্রামের জায়গা এখনো নিতে পারেনি ম্যাক্স। গণমাধ্যম, ব্লগার এবং সরকারি কর্মকর্তারা যে পাবলিক চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে সংবাদ ও মতামত পৌঁছে দেন, সেগুলো ম্যাক্সে এখনো তেমন উন্নত নয়। গার্ডিয়ানের সাথে আলাপকালে কয়েকজন ব্যবহারকারী জানান, অ্যাপটির ডিজাইন টেলিগ্রামের মতোই, তবে গোপনীয়তা ও নজরদারি নিয়ে তাদের গভীর উদ্বেগ রয়েছে। মস্কোর ৩৪ বছর বয়সী বাসিন্দা নিকোলাই বলেন, “ম্যাক্স ব্যবহার করার সময় মনে হয় — আপনি জানেন না আর কে বা কারা আপনাকে নজরদারিতে রাখছে। অ্যাপটি দেখতে আধুনিক হলেও ব্যবহারের সময় সব সময় একটা অশুভ অনুভূতি হয়।”
রয়া এনসাফির মতে, ম্যাক্সের দ্রুত বিস্তার একটি ‘সতর্কবার্তাসূচক সংকেত’। চীন ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠায় প্রায় ৩৫ বছর নিয়েছে, কিন্তু রাশিয়া মাত্র এক দশকে মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় বন্দী করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, “পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, ব্যক্তিগত যোগাযোগের প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে। কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর পক্ষ থেকে আসা এই আক্রমণাত্মক নিয়ন্ত্রণচেষ্টা অত্যন্ত তীব্র।” ম্যাক্স ও ভিকোনতাকতের পক্ষ থেকে গার্ডিয়ানের প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।




