এশিয়ার অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার র্যামন ম্যাগসাইসাই এবার পেলেন বাংলাদেশের সমাজকর্মী ও ফ্রেন্ডশিপ প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান। বাংলাদেশের চরাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে দুই দশকের বেশি সময় ধরে নিরলস কাজ করার স্বীকৃতিস্বরূপ এই পুরস্কার দেওয়া হলো তাকে। রুনা খান তার এই দীর্ঘ পথচলায় কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতা, সততা আর মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাকে হাতিয়ার করে এগিয়েছেন। সম্প্রতি তার অফিসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযুদ্ধ দেখে তিনি গভীরভাবে উদ্বেলিত হয়েছিলেন এবং সেখান থেকেই মানবসেবায় আত্মনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
ফ্রেন্ডশিপ নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি চমকপ্রদ কাহিনি। তার সাবেক স্বামী ইভস মার ফ্রান্স থেকে একটি জাহাজ দেশে আনার সময় কাগজপত্রে ফ্রেন্ডশিপ নামে একটি নিষ্ক্রিয় সংস্থার নাম ব্যবহার করেছিলেন। সেই নামটি রুনা খানের মনে দাগ কাটে এবং তিনি সেই নামেই যাত্রা শুরু করেন। এখন সেই জাহাজই চরবাসীর জন্য ভাসমান হাসপাতাল হিসেবে কাজ করছে। তিনি জানান, এই দীর্ঘ সময়ে জাহাজে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, কিন্তু কখনো চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটেনি। এমনকি একবার একদল ডাকাত চিকিৎসা নিতে এসেছিল; তারা চিকিৎসা পেয়ে কৃতজ্ঞতায় বলে গেছে, কেউ এই জাহাজের ক্ষতি করতে চাইলে তারাই প্রতিরোধ করবে। এটি সততা ও আস্থারই ফসল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুধু সততাই নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্পৃক্ততাকে ফ্রেন্ডশিপের মূলমন্ত্র মনে করেন রুনা খান। তিনি বলেন, চরবাসীকে কখনো বোঝানো হয় না যে শহর থেকে কেউ তাদের জন্য কিছু করে দিচ্ছে। বরং যেকোনো পরিকল্পনা সবার মতামত নিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়। ফলে সবাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে। দেশের ৬০০-৮০০টি চরে কাজ করছে ফ্রেন্ডশিপ; তার মধ্যে ৫০-৬০ শতাংশে সরাসরি কার্যক্রম চলছে এবং ৮০-৮৫ শতাংশ চরের মানুষ এর সুফল পাচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে রুনা খান একটি যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এসেছেন। তিনি মনে করেন, শুধু চিকিৎসা দিলেই হয় না; রোগীর শিক্ষা, জীবিকা ও সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত না হলে স্বাস্থ্যসেবা অর্থহীন। এই চিন্তা থেকেই তিনি 'ওয়ান সাসটেইনেবল হেলথ' ধারণার পথিকৃৎ হয়েছেন। ফ্রান্সের বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এই মডেলটি তৈরি হয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃত একটি পদ্ধতি হিসেবে অনেক এনজিও অনুসরণ করছে। তিনি বর্তমানে ওয়ান সাসটেইনেবল হেলথ ফোরামের সম্মানসূচক সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষাখাতেও ফ্রেন্ডশিপ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে। প্রত্যন্ত চরে স্কুল স্থাপন করে সেখানকার মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষক বানানো হয়েছে। জাতীয় পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি নীতিশিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও জীবনমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়। ফলে চরের মেয়েরা এখন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
রুনা খানের আরেকটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ হলো 'কালারস অব দ্য চরস' নামে একটি ফ্যাশন হাউস। ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি স্লো ফ্যাশন ধারণায় বিশ্বাসী। এখানে শুধু অর্গানিক তুলা ও প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা হয়, কোনো রাসায়নিক রঞ্জক নয়। চরের নারীরা হাতে সুতা কেটে, বুনে এবং অ্যাজোমুক্ত রং দিয়ে তৈরি করেন উচ্চমানের পোশাক। প্রতিষ্ঠানটির ৯৫ শতাংশ কর্মী নারী। এই উদ্যোগ শুধু নারীর ক্ষমতায়নই নয়, একটি সম্প্রদায়ের আর্থিক ভিত মজবুত করছে। লুক্সেমবার্গ, হল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এসব পোশাকের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
পরিবেশ রক্ষায়ও সক্রিয় রুনা খান। তিনি 'সেভিং রিভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড' নামক আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সাথে যুক্ত। নদীর জলজ জীবন রক্ষা এবং নদীশাসনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন। উপকূলীয় অঞ্চলে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বন সৃষ্টির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে তার নেতৃত্বে। তিনি মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনযাপনে পরিবর্তন না আনলে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়।
রুনা খানের কাজ ও স্বপ্ন যেন মিশে গেছে একাকার। তিনি বিশ্বাস করেন, সবার সাথে মিলেই সবার জন্য কাজ করতে হবে। তার এই অসামান্য অবদান আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার তার এই পথচলার আরেকটি মাইলফলক।



