চীন-নেপাল সীমান্তে গত সপ্তাহে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট কাদাপানি ও পাথরের ঢলে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে হিমালয় অঞ্চল। এই দুর্যোগকে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ফল বলে উল্লেখ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তাঁর মতে, এটি কোনো সাধারণ বন্যা ছিল না, বরং তুষার ও বরফের বিশাল ধসের কারণে সৃষ্ট এক বিরাট বিপর্যয়, যা এই অঞ্চলের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

দুর্যোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯৩৯ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে নেপাল সরকার। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪ হাজার মানুষ। সরকারের প্রাথমিক ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পুনর্গঠনে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। তবে ধসের সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শাহ বলেন, রাসুয়ার ভোটেকোশি নদীতে যে ঢল নেমে এসেছে, তা নিছক বন্যা নয়। হিমালয় অঞ্চলের বরফ ও তুষারের বিশাল অংশ ধসে পড়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে যে ঝুঁকিগুলো দিন দিন বাড়ছে, সেগুলোকে আর উপেক্ষা করা যাবে না। তাই এই অঞ্চলের মানুষকে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

প্রায় তিন কোটি জনসংখ্যার দেশ নেপাল মূলত গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে এই দেশটির অবদান নগণ্য। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক পরিণতি বহন করতে হচ্ছে তাদেরই। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেপালের অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, এখনই সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করার।

হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার বিস্তৃত অঞ্চলের হিমবাহগুলো শুধু পার্বত্য এলাকার নয়, পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য পানির অপরিহার্য উৎস। পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২৪ কোটি মানুষ এবং নদী উপত্যকার আরও প্রায় ১৬৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই হিমবাহের পানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে নেপাল সফরের সময় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হিমবাহ গলনের দ্রুততাকে ‘পৃথিবীর ছাদ ধসে পড়ার’ সঙ্গে তুলনা করে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।

গত বুধবার সংঘটিত এই দুর্যোগের পর জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেছেন, এই ঘটনা পার্বত্য পরিবেশগুলোর কতটা ভঙ্গুর অবস্থা, তার এক বিধ্বংসী স্মারক। নেপালের অর্থনীতি ইতোমধ্যে নানা চাপের মুখে রয়েছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে এখন বিশাল এই দুর্যোগ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জও যোগ হয়েছে।