কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অনলাইন জুয়ার প্রাদুর্ভাব এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। কর্মহীনতা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চাপে পড়ে বিপুল সংখ্যক তরুণ শরণার্থী অনলাইন জুয়ার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা পরোক্ষভাবে হত্যা, অপহরণ এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইউএনএইচসিআর-এর 'জয়েন্ট প্রটেকশন মনিটরিং' প্রতিবেদনে এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে হত্যা ও শারীরিক নির্যাতনসহ ৪৭০টি অপরাধমূলক ঘটনায় ৫৯২ জন রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী হয়েছেন, যা প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে।

একজন শরণার্থীর বাস্তব অভিজ্ঞতা এই সংকটের গভীরতা ফুটিয়ে তোলে। জাহেদুল্লাহ নামের এক ব্যক্তি জানান, ২০২২ সালে বেকার হয়ে পড়ার পর বন্ধুর প্রলোভনে তিনি অনলাইন জুয়ায় জড়ান। শুরুতে মুনাফা করলেও পরবর্তীতে তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। জেদের বশে স্ত্রীর গয়না বিক্রি এবং আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার নিয়ে পুনরায় জুয়া খেলে তিনি বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় চাপান। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সহায়তা এবং বিদেশে থাকা ভাইয়ের পাঠানো টাকায় তিনি ঋণ শোধ করলেও, অনেকের ক্ষেত্রে এই ঋণের চাপ তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)-এর কর্মকর্তাদের মতে, ক্যাম্পে ঘটে যাওয়া অপহরণের প্রায় ৯৫ শতাংশই মূলত 'স্বেচ্ছায় অপহরণ'। জুয়ায় টাকা হেরে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য অনেক রোহিঙ্গা যুবক নিজেদের অপহরণের নাটক সাজায়। উদাহরণ হিসেবে গত ৮ সেপ্টেম্বর চার নম্বর ক্যাম্পের নবী হোসেনের কথা বলা হয়েছে, যাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল; অভিযোগ যে তিনি জুয়ার ঋণের কারণে নিজেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিলেন।

তবে এই অপরাধ দমন করতে এপিবিএন কিছু প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছে। জুয়াড়িরা ভিপিএন (VPN) ব্যবহার করে এবং স্থানীয়দের এনআইডি-র মাধ্যমে নিবন্ধিত সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এছাড়া লেনদেনের টাকা বিভিন্ন স্থানে ক্যাশআউট হওয়ায় নজরদারি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত জায়গার মধ্যে বিপুল পরিমাণ কর্মক্ষম যুবকের অলস বসে থাকা এই অপরাধ বৃদ্ধির মূল কারণ। বাংলাদেশ সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ১২ লাখ ২ হাজার ৩৪ জন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার মধ্যে ৫ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক। এদের অধিকাংশেরই কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান নেই। যদিও সরকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার কথা বিবেচনা করে তাদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের বিপক্ষে, তবে কিছু বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেমন, অক্সফ্যামের সহায়তায় সাতটি লার্নিং সেন্টারে লাইব্রেরি স্থাপন করা হয়েছে যাতে যুবকরা পড়াশোনায় ব্যস্ত থাকে।

সরকারের শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান জানান, এই জনগোষ্ঠী জন্মগতভাবে সহিংস পরিবেশের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে এবং তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। তবে বর্তমানে গোয়েন্দা সংস্থা ও এপিবিএন-এর সমন্বিত প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং ভেরিফিকেশন আরও কঠোর করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।