বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ এবং তাদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে সাবেক সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর তীব্র সমালোচনা করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী। তার মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হলেও বাস্তব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল। বৃহস্পতিবার কক্সবাজারের উখিয়ায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের পর শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
জহরত আদিব চৌধুরী অভিযোগ করেন যে, বিগত সরকারের সময়ে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে প্রচার চালানো হয়েছে, তার পেছনে অনেকের লক্ষ্য ছিল নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া। পত্রপত্রিকায় এসব কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রচার হলেও প্রকৃত ভিকটিম অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের জীবনযাত্রা কতটা উন্নত হয়েছে বা তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী ছিল, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন। তার ভাষায়, এসব তৎপরতা ছিল মূলত 'ফাঁকা বুলি'।
বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শনের সময় সংসদীয় কমিটির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য বণ্টন, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং যাচাই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া তারা রোহিঙ্গা তরুণদের সাথে কথা বলে তাদের অনিশ্চয়তার কথা শোনেন। কমিটির সভাপতি জানান, প্রায় এক দশক এখানে অবস্থান করলেও রোহিঙ্গারা তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অন্ধকারে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েদের পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য, কারণ তাদের নিজ দেশে ফেরার সময় একটি শিক্ষিত ও সক্ষম সমাজ হিসেবে গড়ে ওঠা প্রয়োজন।
প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, কেবল জোর করে মিয়ানমারে পাঠিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, কারণ এতে প্রত্যাবাসন টেকসই হয় না। তিনি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন। এই প্রক্রিয়ায় শুধু বাংলাদেশের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর দায়িত্ব পালন করা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে আসাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। এই সংকট মোকাবিলায় প্রচলিত সহায়তার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর যাকাত তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনার কথা তিনি সামনে আনেন।
পরিদর্শনকালে তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মিয়ানমারের পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হলেও সনদের স্বীকৃতির বিষয়ে জটিলতা রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল সেবা, সিমকার্ড ব্যবহার এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এসব বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের পর সুপারিশ প্রদান করা হবে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার পানি ও স্যানিটেশন সমস্যা নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি।
সফর চলাকালীন প্রতিনিধি দলটি উখিয়ার ক্যাম্প-৬-এর রোহাং হেরিটেজ সেন্টার, ক্যাম্প-৯-এর তুর্কি হাসপাতাল, ক্যাম্প-৪-এর বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির খাদ্য বিতরণকেন্দ্র এবং ইউএনএইচসিআর-আরআরআরসির যৌথ যাচাই কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। জহরত আদিব চৌধুরীর নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন সংসদ সদস্য এস কে আজিজুল বারী, সৈয়দ আল নোমান, সানজিদা ইসলাম ও মীর আহমাদ বিন কাসেম। পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ও প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ প্রদান এবং সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করবেন তিনি।




