বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক ঘটকের ১০১তম জন্মবর্ষে তাঁর সৃষ্টি এবং জীবনদর্শন নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা ঘটকের চলচ্চিত্র জীবনের অন্যতম মাইলফলক ছিল 'তিতাস একটি নদীর নাম'। এই চলচ্চিত্রটি কেবল একটি নদীর গল্প নয়, বরং এটি দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের এক দীর্ঘশ্বাসের দলিল। ছবির নামটিতে যে নদীর কথা বলা হয়েছে, তা অদ্বৈত মল্লবর্মণের লেখায় প্রাণ পেয়েছিল, আর ঘটকের ক্যামেরায় দেখা যায় সেই নদীর ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়ার করুণ দৃশ্য।
১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই শুটিং শুরু হওয়া এই ছবিটির মুক্তি ঘটে ১৯৭৩ সালের ২৭ জুলাই। প্রযোজক হাবিবুর রহমান খানের প্রবল আগ্রহ এবং জেদের কারণেই স্বাধীনতার পর ঘটক তাঁর জন্মভূমিতে ফিরে এসে এই ছবিটি নির্মাণ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আরিচা এবং নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যের বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে এর লোকেশন শুটিং করা হয়। ছবিতে অভিনয় করেছেন কবরী, প্রবীর মিত্র, রোজি সামাদ এবং গোলাম মুস্তাফার মতো প্রথিতযশা শিল্পীরা। এছাড়া লোকজ গানের সুর এবং ওস্তাদ বাহাদুর হোসেন খানের সরোদবাদন ছবির বিষণ্ণ আবহকে আরও গভীর করেছে। গল্পের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল মালো জেলেদের জীবন, যেখানে বিয়ের রাতে বধূ অপহৃত হওয়া এবং নদীর সাথে সাথে মানুষের জীবনের নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কাহিনী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ঋত্বিক ঘটকের সিনেমার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর মেলোড্রামার ব্যবহার। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক অ্যাড্রিয়ান মার্টিন এবং অন্যান্য সমালোচকদের মতে, ঘটক মেলোড্রামাকে রাজনৈতিক অর্থবহ করতে ব্যবহার করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ইতিহাস যাদের মতামত চায়নি, তাদের জীবনে ঘটনাগুলোই নিয়তি হয়ে নেমে আসে। তাঁর এই শৈলী জার্মান নির্মাতা রাইনার ভের্নার ফাসবিন্ডারের সাথে তুলনা করা হয়, তবে ঘটকের মেলোড্রামা ছিল খোলা আকাশের নিচে, লোকগান এবং নদীর সাথে মিশে থাকা এক সমষ্টিগত যাতনার বহিঃপ্রকাশ।
ঘটকের প্রভাব বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতাদের মাঝেও স্পষ্ট। জাতীয় চলচ্চিত্র পদকপ্রাপ্ত নুরুল আলম আতিক তাঁর 'ডুবসাঁতার' চলচ্চিত্রে ঘটকের নারীদর্শন ও সম্পর্কের গভীরতাকে ধারণ করেছেন। এমনকি সংগীতেও তিনি ঘটকের প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে মোল্লা সাগরের 'ভবার ভিটা' এবং নাঈম মোহাইমেনের 'আ মিসিং ক্যান অব ফিল্ম' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঘটকের স্মৃতি ও তাঁর ঘর হারানো বা উৎখাত হওয়ার যাতনা ফুটে উঠেছে।
উল্লেখ্য যে, মুক্তির সময়ে এই ছবিটি ব্যবসায়িক সফলতা পায়নি এবং অনেক সমালোচকের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছিল। তবে পরবর্তীতে এর আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন বৃদ্ধি পায়। ২০০৭ সালে বিএফআই-এর জরিপে এটি সেরা ১০টি বাংলাদেশি ছবির তালিকায় স্থান পায় এবং ২০১০ সালে মার্টিন স্করসেজির 'ওয়ার্ল্ড সিনেমা প্রজেক্ট' এর একটি ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করে।
ট্র্যাজিক দেশভাগ এবং মানসিক অবসাদ তাঁর শিল্পের মূল চালিকা শক্তি ছিল। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক যে, যে মানুষটি ভাগ হয়ে যাওয়া বাংলার বেদনা নিয়ে ছবি বানিয়েছেন, ২০২৪ সালে রাজশাহীতে তাঁর পৈতৃক বাড়িটি স্থানীয়দের দ্বারা ভেঙে ফেলা হয়। তাই তাঁর জন্মবর্ষে কেবল শ্রদ্ধার্ঘ্য নয়, বরং তাঁর রেখে যাওয়া 'যদি'-গুলোর উত্তর খোঁজা এবং নদী ও চলচ্চিত্র সংস্কৃতি রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আজ আরও প্রবল হয়ে উঠেছে। তাঁর দর্শন ছিল 'ভাবা প্র্যাকটিস করা', অর্থাৎ যা ঘটেনি তা কল্পনা করতে শেখা, যা আজও নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।




