পার্বত্য চট্টগ্রামের কিশোরীদের ফুটবল প্রতিভা বিকাশে নিজের জীবন ও সঞ্চয় বাজি ধরে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন কোচ সুইহলামং মারমা। ২০১৮ সালে মাত্র ১৪ জন কিশোরীকে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন একটি ফুটবল একাডেমি, যার যাত্রা শুরু হয়েছিল আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে নেওয়া চার লাখ টাকা ঋণের মাধ্যমে। বর্তমানে এই একাডেমিতে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা ৪২ জন কিশোরী কঠোর প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা পরিষদ মাঠে তাদের প্রতিদিন দুই বেলা অনুশীলনের দৃশ্য এখন নিয়মিত।

২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সুইহলামং মারমার দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের মেয়েদের মূলধারার ফুটবলে ফিরিয়ে আনা। এই লক্ষ্য পূরণে তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। একাডেমির আবাসন হিসেবে একটি ভাড়া বাসা ব্যবহার করেন তিনি, যার মাসিক ভাড়া ২০ হাজার টাকা। শুরু থেকেই তীব্র অর্থসংকটে ভুগেছেন এই কোচ। নিজের ও স্ত্রীর বেতনের একটি বড় অংশ তিনি একাডেমির পেছনে ব্যয় করেন। এমনকি খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় জার্সি, বল ও জুতা কেনার জন্য বিভিন্ন সমবায় সমিতি এবং এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে তাঁকে। আগে খেলোয়াড়দের থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার সব খরচ তিনি নিজে বহন করলেও, গত বছর থেকে সামর্থ্যবান খেলোয়াড়দের কাছ থেকে মাসে ১ থেকে ১.৫ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এককালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।

সুইহলামং একাডেমির সাফল্য এখন দৃশ্যমান। এখান থেকে আটজন কিশোরী জাতীয় নারী ফুটবল দলের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে। এছাড়া খেলোয়াড় কোটায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ৬ জন, পুলিশে ১ জন, বিমানবাহিনীতে ১ জন এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৫০ জন নিয়োগ পেয়েছেন। ফুটবলের পাশাপাশি ফেন্সিংয়ে আটজন, জুডোতে চারজন এবং সাইক্লিংয়ে একজন খেলোয়াড় এখান থেকে উঠে এসেছেন। আরও ছয়জন কিশোরী বিকেএসপি-তে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। উল্লেখ্য, বর্তমান জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, মনিকা চাকমা, আনাই মোগিনী এবং আনুচিং মোগিনী ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে সুইহলামং মারমার কাছেই প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন, যেখানে তিনি সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

এ একাডেমির প্রশিক্ষণার্থীদের স্বপ্ন এখন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামা। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি থেকে আসা আনিষা তঞ্চঙ্গ্যা, যে বর্তমানে আনসার একাডেমির ফেন্সিং টিমে খেলছে, তার লক্ষ্য ঋতুপর্ণাদের মতো জাতীয় দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। খাগড়াছড়ির অর্কি চাকমা এবং রাঙামাটির আকর্ষণী চাকমাও কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুত করছেন। আকর্ষণী ইতিমধ্যে জাতীয় বয়সভিত্তিক দল থেকে চিঠি পেয়ে উচ্ছ্বসিত।

সুইহলামং মারমার বিশ্বাস, পাহাড়ি মেয়েদের শারীরিক সক্ষমতা এবং সুপ্ত প্রতিভা সঠিক পরিচর্যা পেলে তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে আরও সফল করতে পারবে। সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পেলে এখান থেকে আরও অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি হবে। কাউখালীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাজিব হোসেন জানান, এই উদ্যোগ মেয়েদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে এবং উপজেলা প্রশাসন থেকে তাদের ক্রীড়াসামগ্রী ও খাবারের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।