দেশে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দিতে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের কার্ড ব্যবহার হয়ে আসছে। রেশন কার্ড, ভিজিএফ, ভিজিডি, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড। আবার ব্যক্তিগত পরিচয়ের জন্য আছে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএন। এসব বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাকে একীভূত করে সব নাগরিকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা এক-আইডি নামে এই ব্যবস্থায় জন্মের পর থেকেই প্রত্যেক নাগরিককে একটি নির্দিষ্ট পরিচয় দেওয়া হবে, যা সারা জীবন স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবায় ব্যবহার করা যাবে।

তবে এই ধারণা নতুন নয়। ব্রিটিশ আমলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পর শহরাঞ্চলে বিধিবদ্ধ রেশনিং চালু হয়েছিল। পাকিস্তান আমলেও পূর্ব পাকিস্তানে সেই ব্যবস্থা বহাল ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে তা স্ট্যাচুটরি রেশনিং (এসআর) নামে পরিচিত হয়। কম দামে চাল-গম কেনার সুবিধা দিত এই ব্যবস্থা, কিন্তু কালক্রমে অনিয়ম, ভুয়া বিতরণ ও কালোবাজারের অভিযোগে তা সংকুচিত হয়ে ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর জায়গায় কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) ও টেস্ট রিলিফের মতো কর্মসূচি চালু হয়। তবে সেনাবাহিনী, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীতে রেশনব্যবস্থা এখনো বিদ্যমান।

রেশন কমলেও কার্ডনির্ভর সহায়তার প্রবণতা থেমে থাকেনি। নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ভিজিএফ, ভিজিডি, খাদ্যবান্ধব, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ নানা কার্ড চালু হয়েছে, যার প্রতিটির জন্য আলাদা তালিকা ও ব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ভর্তুকি মূল্যে তেল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ বিক্রির কর্মসূচিও রয়েছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে জনপ্রিয়।

বর্তমান সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে। গত ১০ মার্চ ১৪টি উপজেলায় এর পাইলট কর্মসূচি শুরু হয়, যেখানে নির্বাচিত পরিবারগুলো মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা পাচ্ছে। পাঁচ বছরে প্রায় চার কোটি পরিবারকে আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। অন্যদিকে কৃষকদের জন্য স্মার্ট কৃষক কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৪ এপ্রিল প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে ১০ জেলার ১১টি ব্লকে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়। ফসল উৎপাদক, বর্গাচাষি, মৎস্যচাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরা সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষিঋণ, সেচ, কৃষিযন্ত্র, প্রণোদনা, কৃষিবিমা ও প্রশিক্ষণসহ ১০ ধরনের সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া প্রবাসী কার্ড ও ন্যাশনাল হেলথ কার্ড চালুর ঘোষণা থাকলেও সেগুলো এখনো প্রস্তুতি পর্যায়ে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ একাধিক কার্ডের বদলে সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সিঙ্গাপুরে সিংপাস নামে জাতীয় ডিজিটাল আইডি রয়েছে, যা দিয়ে আড়াই হাজারের বেশি সরকারি-বেসরকারি সেবা নেওয়া যায়। ভারতে আধার কার্ড ১২ অঙ্কের বায়োমেট্রিক পরিচয়, যা ভর্তুকি, পেনশন, বৃত্তি, ব্যাংক হিসাব, সিম ও ভ্রমণসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলেও সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর (এসএসএন) জন্ম থেকেই নেওয়ার সুযোগ আছে, যা কর, ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য গভ.ইউকে ওয়ান লগইন চালু করেছে, যার মাধ্যমে ২০০টির বেশি সরকারি সেবায় প্রবেশ করা যায়।

এখন বাংলাদেশও সেই পথে এগোচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে, যার মেয়াদ ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এটি বাস্তবায়ন করবে এবং অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে জন্মনিবন্ধনের পর ১৮ বছর বয়সে এনআইডি দেওয়া হয়, কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় শিশুকাল থেকেই স্থায়ী পরিচয় দেওয়ার কথা। সরকারের স্লোগান ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’। প্রকল্পে ১৮ কোটি নাগরিকের পরিচয় তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও কার্ড উৎপাদন ধরা হয়েছে ২০ কোটি, যার মোট ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এক-আইডি চালু হলে এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের আলাদা কার্যকারিতা থাকবে না বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও টিআইএনের তথ্যভান্ডারের মধ্যে আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে বারবার একই তথ্য নেওয়ার প্রয়োজন অনেক কমে যাবে। ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও সমন্বিত পরিচয়ের আওতায় আনার বিষয়টি নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে বিবেচনা করা দরকার বলে তাঁরা মত দিয়েছেন। কার্ডে কী কী তথ্য থাকবে তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মূল চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিককে একবার শনাক্ত করে তার তথ্য নিরাপদ রাখা এবং সঠিক সেবা পৌঁছে দেওয়া—এই সমন্বয় কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এক-আইডির ভবিষ্যৎ।